লবণাক্ততা, বাড়তি উৎপাদন খরচ, ঋণের বোঝা ও বাজারের বীজনির্ভরতা—সব মিলিয়ে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় কৃষকেরা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। সুন্দরবনসংলগ্ন এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন লোনা পানি ব্যবহার করে চিংড়ি চাষের ফলে অনেক জমিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। এর প্রভাবে ধান ও সবজি চাষে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। তবু নিজেদের খাদ্য ও জীবিকার স্বার্থে কৃষকেরা জমিতে ফসল ফলানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, লবণাক্ত জমিতে উৎপাদন ধরে রাখতে অনেক সময় বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। এতে কৃষির খরচ বাড়ছে। ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে গিয়ে মৌসুমের শুরুতেই অর্থসংকটে পড়ছেন ক্ষুদ্র কৃষকেরা। অনেকে সার ও কীটনাশকের দোকান, বীজ কোম্পানি, মহাজন কিংবা ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ধার নিচ্ছেন। পরে ফসল বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সংসারের অন্যান্য ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় বীজ
একসময় কৃষকেরা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ রেখে পরের মৌসুমে ব্যবহার করতেন। প্রতিবেশীদের মধ্যে বীজ বিনিময়েরও প্রচলন ছিল। কিন্তু লবণাক্ততার কারণে স্থানীয় অনেক জাত চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ায় বাজারের বীজের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি গ্রামের কৃষক যোগেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, কোম্পানির প্রতিনিধিরা নতুন জাতের হাইব্রিড বীজ, সার ও কীটনাশক নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রথমবার বিনামূল্যে বা কম দামে বীজ পাওয়ার পর বেশি ফলনের আশায় অনেক কৃষক পরের বছরও সেই কোম্পানির উপকরণ কেনেন। এতে স্থানীয় বীজ ও পূর্বপুরুষদের কৃষিজ্ঞান চর্চার সুযোগ কমে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। যোগেশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, বারসিকের সহযোগিতায় তিনি ও কয়েকজন কৃষক আবার স্থানীয় জাতের বীজ চাষ এবং প্রাকৃতিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের চেষ্টা করছেন।
প্রকৃতি ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় ফলদ গাছ ও বন্য প্রাণীর উপস্থিতি কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, আগে বাড়ির আঙিনায় আম, জাম, লেবু, নারিকেল, সবেদা ও জামরুলের মতো নানা ফলের গাছ দেখা যেত। এখন অনেক এলাকায় এসব গাছ কমে গেছে। পাখি, ব্যাঙ, শামুক ও জোনাকির মতো প্রাণীর সংখ্যাও আগের তুলনায় কম বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ।
রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগ রয়েছে কৃষক ও স্থানীয়দের মধ্যে। তবে নির্দিষ্ট রোগের সঙ্গে এসব উপকরণের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও স্বাস্থ্যতথ্য জরুরি। কৃষকদের নিরাপদ ব্যবহারের নিয়ম, সুরক্ষাসামগ্রী এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
নারী কৃষকের বীজভান্ডার
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদে ভূমিকা রাখছেন শ্যামনগরের কয়েকজন কৃষক। বারসিকের সহযোগিতায় মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কুলতলি গ্রামের টুম্পা রানী মণ্ডল নিজের ও বর্গা নেওয়া জমিতে ধান ও সবজি চাষে প্রাকৃতিক সার, জৈব বালাইনাশক এবং পোকা ধরার ফাঁদ ব্যবহার করছেন।
টুম্পা রানী জানান, তাঁর বাবা-দাদারা বাড়ির আবর্জনা, সবজির উচ্ছিষ্ট, ছাই ও পচা পাতা জমিতে ব্যবহার করতেন। এখন বাজার থেকে বীজ ও কৃষি উপকরণ কিনতে হয়। তবে তিনি স্থানীয় বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করেছেন। প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল কিনতে নিয়মিত যোগাযোগ করেন এমন ক্রেতাও তৈরি হয়েছে তাঁর।
ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট গ্রামের কৃষক কল্পনা রানী মিস্ত্রি নারী কৃষকদের নিয়ে কয়েকটি দল গড়ে তুলেছেন। এসব দলের সদস্যরা প্রায় এক দশক ধরে স্থানীয় ধান, সবজি, ফল ও ফুলের বীজ সংরক্ষণ এবং বিনিময় করছেন। কল্পনা রানীর সংগ্রহে দুই শতাধিক জাতের স্থানীয় বীজ রয়েছে বলে তিনি জানান। এলাকার কৃষকদের মধ্যে বীজ বিতরণ ও বিনিময়ের মাধ্যমে এই বৈচিত্র্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।
উপকূলের জন্য বিশেষ কৃষি উদ্যোগের দাবি
কৃষকদের মতে, উপকূলীয় এলাকার কৃষি সমস্যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। লবণাক্ততা ও দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা, সহজ শর্তে ঋণ, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ এবং কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন। শুধু বেশি ফলনের লক্ষ্য নয়, উৎপাদন ব্যয়, মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকেও কৃষি পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, শ্যামনগরের লবণাক্ত জমিতে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বিভাগটি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। লবণসহিষ্ণু জাতের সম্প্রসারণ, জৈব সার, পলিমালচ, ড্রিপ সেচ, মিনি পুকুর, বস্তায় সবজি চাষ, ঘেরের আইলে তরমুজ ও সবজি উৎপাদন এবং বেড-নালা পদ্ধতিতে চাষাবাদ এর মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি উপযোগী ফলের গাছ লাগানো এবং বিনা চাষে বিভিন্ন ফসল উৎপাদনেও কাজ চলছে।
উপকূলের কৃষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি কৃষিতে নিজস্ব বীজ ও জ্ঞান ধরে রাখাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার হলে পরিবেশবান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পথ তৈরি হতে পারে।




