‘আমরা নিজেরা বিষ খাই না, অন্যকেও বিষ খাওয়াতে চাই না। সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলে উন্নয়ন সম্ভব।’—কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের উপকূলীয় নারী চন্দনা রানী। জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে পরিবেশবান্ধব কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে নিজের পরিবারে ফিরিয়েছেন স্বচ্ছলতা।
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের চন্দনা রানী (৩০)। স্বামী রঞ্জন মন্ডল দিনমজুর। দুই সন্তান সজীব (৯) ও ধৃতি (৩) নিয়ে চার সদস্যের পরিবার তাদের। প্রায় ৩০ শতক জমিতে বসতবাড়ি ঘিরে গড়ে তুলেছেন বৈচিত্র্যময় কৃষি খামার।
চন্দনা রানীর বাড়িতে স্থানীয় জাতের হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু, মৌসুমি সবজি, স্থানীয় প্রজাতির মাছ, ঔষধি ও ফলজ গাছ রয়েছে। পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন স্থানীয় জাতের চারা উৎপাদনের নার্সারি। পুকুরে মাছ, পুকুরপাড়ে ফলজ গাছ এবং মাচায় সবজি চাষের সমন্বিত পদ্ধতিও অনুসরণ করছেন তিনি।
বস্তায় আদা, ফেলে দেওয়া পাত্রে মরিচ, মাচা ও বেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন চন্দনা। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহার, জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিবেশবান্ধব চুলা এবং মাটির তৈরি হাজল ব্যবহার করে হাঁস-মুরগির ডিম ফোটানোর মতো নানা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিও কাজে লাগাচ্ছেন তিনি।
নিজ উদ্যোগে একটি দেশীয় বীজ ব্যাংক গড়ে তুলেছেন চন্দনা রানী। সেখানে স্থানীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিনিময় করা হয়। এলাকার নারীদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট সংগঠন। সংগঠনের মাধ্যমে পরিবেশ ও মানবিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তিনি।
নিজের উৎপাদিত কৃষিপণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আয় করছেন চন্দনা। পাশাপাশি বাড়িতে সেলাইয়ের কাজও করেন। তার এ কাজে সহযোগিতা করেন দিনমজুর স্বামী রঞ্জন মন্ডল। বিভিন্ন উৎস থেকে আয় বাড়ায় বর্তমানে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। চন্দনা রানী বলেন, ‘এখন আমার পরিবারের সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। নিয়মিত সঞ্চয় করছি। স্বপ্ন হলো বসতঘরটি সুন্দর করা এবং দুই সন্তানকে লেখাপড়া শেখানো।’
স্থানীয়রা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে চন্দনা রানীর গড়ে তোলা কৃষি খামার উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পারিবারিক খাদ্যনিরাপত্তার একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি ও সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূলের আরও নারীরা এ ধরনের কৃষি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হবেন।




