একসময় যেখানে ফুটবল-ক্রিকেটের প্রতিযোগিতা আর নানা সামাজিক আয়োজন ঘিরে মানুষের পদচারণায় মুখর থাকত, সেই মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে হারিয়েছে তার পরিচিত পরিবেশ। অবশেষে কক্সবাজারের পেকুয়া বাজারসংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দখলসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি মাঠটি সংস্কারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
পেকুয়া বাজারের আলহাজ্ব কবির আহমদ চৌধুরী বাজার ও ছালেহা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত মাঠটি প্রায় এক শতাব্দী ধরে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত। ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আয়োজনে ব্যবহৃত হতো এটি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে এখানে জানাজার নামাজও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু প্রায় ৩০ বছর আগে মাঠের বিভিন্ন অংশে দোকান ও মার্কেট নির্মাণের মাধ্যমে জায়গা দখলের অভিযোগ ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে খেলাধুলার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। উন্মুক্ত মাঠের অভাবে এলাকার শিশু-কিশোর ও তরুণদের ক্রীড়াচর্চার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট ভূমি নথি অনুযায়ী, মাঠটির ৯৪ শতক জমি বিএস ৪৮৬ খতিয়ানের ৪৬৪৯ নম্বর দাগে সরকারি খাসজমি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
মাঠটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কামরান জাদিদ মুকুট প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়। প্রায় ২০ দিনের প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে মাঠটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান, কামরান জাদিদ মুকুট ও স্থানীয় সাংবাদিকেরা।
এ সময় মাঠের কয়েকটি অংশের মালিকানা ও দখল নিয়ে আপত্তির মুখে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের। বিএনপি নেতা সরওয়ার আলমসহ কয়েকজনকে জমির বৈধতা প্রমাণে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দোকান বা মার্কেটের মালিকানার বৈধ কাগজ থাকলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উপজেলা ভূমি অফিসে জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে নথি না পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছালেহা কবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য এমরান জাদিদ মনে করেন, মাঠটি ফিরে পাওয়া গেলে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবেন। তাঁর মতে, খেলাধুলার সুযোগ শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠার পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধন তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
জমিদার পরিবারের সদস্য ফরহাদ চৌধুরীও উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর দাদা কবির আহমদ চৌধুরীর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাঠটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি সরকারি জমি দখলে রাখা ব্যক্তিদের প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
কামরান জাদিদ মুকুট বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থাপনার কারণে মাঠটি ব্যবহারের সুযোগ কমে গিয়েছিল। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঐতিহ্যটি রক্ষার লক্ষ্যেই প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন তারা।
পেকুয়া থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, মাঠের জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ার বিষয়ে নথি রয়েছে। দখলসংক্রান্ত বিষয়গুলো যাচাই করে প্রশাসনের মাধ্যমে জায়গাটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ চলছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আনিসুল ইসলাম বলেন, মাঠের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে দেখা হয়েছে। যাঁরা জায়গাটির ওপর দাবি করছেন, তাঁদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় দলিল জমা দিতে বলা হয়েছে। এসব নথি যাচাইয়ের পর আইন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মাঠটি আবার খেলাধুলার উপযোগী করে তোলাই প্রশাসনের লক্ষ্য।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জমির সীমানা ও মালিকানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে দ্রুত মাঠটি উন্মুক্ত করা হবে। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পেকুয়ার শতবর্ষী এই মাঠ আবারও এলাকার সামাজিক ও ক্রীড়াঙ্গনের মিলনস্থল হয়ে উঠবে।



