কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালনায় একাধিক সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় মাঠপর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সেবাগ্রহীতারা। পরিস্থিতির কারণে সরকারি এই সেবাকেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরামর্শ না পেয়ে অনেককেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে পদ রয়েছে ১৫৯টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৮৭ জন। অর্থাৎ ৭২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। কর্মীস্বল্পতার প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাসেবা থেকে শুরু করে পরিবার পরিকল্পনাবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার দম্পতিদের কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
কার্যালয়ের বিভিন্ন পদে জনবল ঘাটতির চিত্রও বেশ বিস্তৃত। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদে একজন থাকার কথা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দাপ্তরিক প্রয়োজনে অধিকাংশ সময় ঢাকার সদর দপ্তরে থাকতে হয়। সহকারী মেডিকেল কল্যাণ কর্মকর্তার দুটি পদের মধ্যে একজনকে হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার (পরিবারকল্যাণ) পদে তিনটি অনুমোদিত পদ থাকলেও কর্মরত কেউ নেই। ফার্মাসিস্টের তিনটি পদও শূন্য।
মাঠপর্যায়ের কর্মী সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। স্যাকমোর ছয়টি, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার ১১টি, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের একটি এবং পরিবারকল্যাণ সহকারীর ২৭টি পদে প্রয়োজনীয় কর্মী নেই। এ ছাড়া এমএলএস ও নিরাপত্তাপ্রহরী, আয়া, দাইনার্স এবং গাড়িচালকের পদেও ঘাটতি রয়েছে। সব মিলিয়ে ৭২টি পদে লোকবল না থাকায় সীমিতসংখ্যক কর্মীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।
শুধু জনবল নয়, জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সংকটও সেবাব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সাধারণত কনডম, খাবার বড়ি, ইনজেকশন, আইইউডি বা কপার-টি এবং ইমপ্ল্যান্ট সরবরাহ করা হয়। এসব উপকরণ বিনা মূল্যে পাওয়ার সুযোগ থাকলেও দাউদকান্দিতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত সরবরাহ নেই। ফলে পছন্দ ও প্রয়োজন অনুযায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারছেন না অনেক দম্পতি।
ভুক্তভোগী কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের। বিষয়টি ব্যক্তিগত হওয়ায় প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলতে চান না অনেকে। তবে সেবার ঘাটতির কারণে তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
কার্যালয়ের স্টোরের দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী শাখাওয়াত হোসেন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট চলছে। জরুরি প্রয়োজনে মেরি স্টোপসের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণে আইইউডি বা কপার-টি সংগ্রহ করে সেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ খুবই কম। প্রয়োজনীয় উপকরণ না পেয়ে অনেক সময় সেবাগ্রহীতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে অফিস সহকারী ফারুক হোসেন বলেন, ১৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে ৮৭ জন কর্মী দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এত কম জনবল নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান মানিক বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে এসব উপকরণ সরবরাহ করা হতো। ২০২৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তাঁর আশা, বর্তমান সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেবে। সেটি বাস্তবায়িত হলে আবারও আগের মতো উপকরণ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে গেছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ২০১৮ সাল থেকে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগসংক্রান্ত মামলা চলমান থাকায় ওই পদে নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জনবল নিয়োগ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দাউদকান্দিতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে এমন পরিবারগুলো বিনা মূল্যের উপকরণ ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হলে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই মাঠপর্যায়ে সেবা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল পূরণের পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা জরুরি।



