বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবক। ঋণ শোধ করে পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় কেউ জমি বন্ধক রেখেছিলেন, কেউ স্ত্রীর গয়না বিক্রি করেছিলেন, আবার কেউ ধারদেনা করে জোগাড় করেছিলেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের মৃত্যুর খবর আসার পর সেই পরিবারগুলোর সামনে এখন শোকের পাশাপাশি ঋণের বোঝা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
নিহত বলে খবর পাওয়া তিন যুবক হলেন গোপালপুর উপজেলার বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম, মজিদপুর গ্রামের পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর এবং দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম। পরিবারের ভাষ্য, গত ৭ মে নির্মাণকাজের ভিসায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তারা। সেখানে কাজের আশায় বড় অঙ্কের টাকা খরচ করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে স্বজনদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা
নজরুল ইসলামের রাশিয়াযাত্রার খরচ জোগাতে তার বড় ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অবিভক্ত জমি বন্ধক রেখে ৯ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। এর আগে নজরুল সৌদি আরবেও কাজ করতে গিয়েছিলেন। এবারও পরিবারের আশা ছিল, বিদেশে আয় করে আর্থিক সংকট কাটাবেন তিনি।
নজরুলের ভাতিজা মোহাম্মদ শিহাব জানান, গত ২৯ জুলাই চাচার সঙ্গে তাদের শেষ কথা হয়। সেদিন নজরুল জানিয়েছিলেন, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। মা ও সন্তানদের দেখে রাখার অনুরোধও করেছিলেন তিনি। পরে রাশিয়ায় তার সঙ্গে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
নজরুলের প্রথম সংসারে ১৫ ও ১০ বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে দেড় বছর বয়সী মেয়ে ও ছয় মাসের ছেলে। তার বড় ভাইয়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বন্ধক রাখা জমি ছাড়িয়ে নেওয়ার মতো অর্থ তার হাতে নেই। পরিবারটির আশঙ্কা, ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে জমির অংশ হারাতে হতে পারে।
গয়না বিক্রি করে বিদেশযাত্রা
পবিত্র চন্দ্র সূত্রধর পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় রাশিয়ায় যেতে স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নেন। পরিবারের হিসাবে, বিদেশযাত্রায় তার প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল।
পবিত্রর স্ত্রী জয়া সূত্রধরের দুই মেয়ে—প্রিয়ন্তীর বয়স ১০ বছর, নীলার ৮ বছর। স্বামীর মৃত্যুর খবরের পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। পরিবারের সম্বল পৌনে তিন কাঠার মতো বসতভিটা। পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর জানান, ঋণদাতারা নিয়মিত টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। দেনা শোধ করতে অবশিষ্ট তিন শতাংশ জমি বিক্রির কথাও ভাবছে পরিবার।
পবিত্রর বাবা পরেশ চন্দ্র সূত্রধরের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নিয়োগের কথা বলে ছেলেকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। পরে জোর করে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের কাগজে স্বাক্ষর করানো হয়। ছেলের পরিণতি নিশ্চিতভাবে জানতে চান তিনি। পবিত্র বেঁচে থাকলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং মারা গিয়ে থাকলে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সহায়তাও চেয়েছেন।
ঋণ শোধের চিন্তায় আমিনুলের পরিবার
দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের প্রয়াত কছর উদ্দিনের ছেলে আমিনুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৫ বছর। ব্যবসায় লোকসানের কারণে তার ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা ঋণ হয়েছিল বলে পরিবারের দাবি। সেই দেনা শোধ ও সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বিদেশযাত্রার খরচ জোগাতে জমি বন্ধক ও ধারদেনা করে প্রায় ১০ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন।
স্ত্রী বিউটি বেগম, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে রাশিয়ায় যান আমিনুল। তার বড় ভাই কামরুল হাসানের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় ২৯ মে ভোরে। সেদিন আমিনুল জানিয়েছিলেন, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। চারদিকে মাইন ও ড্রোনের কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি। পরিবারের সদস্যদের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্ধারের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছিলেন।
কামরুল হাসানের ভাষ্য, জামালপুরের আদনান নামের এক সহযাত্রীর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাদের দলের ১৬ জনের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের তিন যুবকও রয়েছেন বলে তাকে জানানো হয়।
৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর খবর
কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ তদন্ত করছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সংস্থাটির ১৪ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। নির্মাণকাজে নিয়োগের কথা বলে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় তাদের। এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করার কাজে বাংলাদেশিদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হতো। ওই ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
টাঙ্গাইলের তিন পরিবারের সংকট এখন দ্বিমুখী—স্বজন হারানোর শোক এবং ঋণ পরিশোধের চাপ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও বসতভিটা রক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো স্বজনদের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য, প্রয়োজনে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সহায়তা চেয়েছে।