চলনবিলে জাল ও নানা কৌশলে অবাধে চলছে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি শিকার। ধানখেত, বিল ও জলাশয়ের আশপাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ তৈরি করে পাখি ধরছেন শিকারিরা। শুধু শিকার নয়, ধরা পড়া পাখি স্থানীয় বিভিন্ন হাটবাজারেও বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে পাখি শিকার ও বেচাকেনা চললেও কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় তা বন্ধ হচ্ছে না। এতে চলনবিলের পাখির নিরাপদ বিচরণ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

প্রতি শীত মৌসুমে চলনবিলের বিল, জলাশয় ও গাছপালাকে ঘিরে দেশীয় ও পরিযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আগমন ঘটে। শিকারিদের নানা কৌশলের কারণে পাখিগুলো নিরাপদে বিচরণ করতে পারছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও উল্লাপাড়া, নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর এবং পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়াসহ পুরো চলনবিলজুড়েই পাখি শিকারের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।

শিকারিরা লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করে তার ওপর জালের ফাঁদ বসান। একটি পাখির পা চিকন সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির ওপর রাখা হয়। বাঁধা পাখির ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটানোর শব্দে আশপাশের অন্য পাখি কাছে এলে জালে আটকা পড়ে। পরে সেগুলো খাঁচায় রেখে বিক্রি করা হয়।

পাখি শিকারি ময়ুনুল হক জানান, শখের বশে গত তিন-চার বছর ধরে তিনি বিভিন্ন স্থানে পাখি শিকার করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিকারি দাবি করেন, প্রতিদিন ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে প্রতিটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করেন।

পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীনজীবনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুর রাজ্জাক নাছিম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে এর বিরূপ প্রভাব পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়তে পারে।

‘চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সাল থেকে তারা চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছেন। গত পাঁচ বছরে অন্তত দুই হাজার শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছেন তারা। তবে পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের আরও নজরদারি প্রয়োজন।

সমাজকর্মী ও ‘দ্য বার্ডস সেফটি হাউস’-এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা পাখি রক্ষায় কাজ করলেও শুধু উদ্ধার ও অবমুক্ত করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিকারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা অপরাধ। এ অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাখি শিকারের তথ্য পেলে অভিযান চালিয়ে তা বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে।