অক্টোবর মাসে যশোরের সড়কগুলোতে ধারাবাহিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন। আহত হয়েছেন আরও ৪৩ জন। মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কা এবং চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মতো ঘটনায় শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মাসের শেষ সপ্তাহে মণিরামপুরের রাজগঞ্জে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের মা ও শিশুর মৃত্যু হয়। ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় মাছবাহী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে পড়ে যান মৌসুমী খাতুন (৩৩) ও তাঁর চার বছর বয়সী ছেলে আব্দুর রহমান। এরপর বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী ট্রাক্টরের চাপায় ঘটনাস্থলে মারা যান মৌসুমী। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় শিশুটির। এ ঘটনায় আহত হন মোটরসাইকেলচালক ওমর ফারুক। পরদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের দাফন সম্পন্ন করেন তিনি।
এর দুই দিন আগে, ২৩ অক্টোবর রাতে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাটে দুটি মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে তিন তরুণের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও দুজন। ১৫ অক্টোবর চৌগাছা-যশোর সড়কের টালিখোলা মোড়ে পিকআপের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে প্রাণ যায় অয়ন হোসেন (২০) ও মিথিলা খাতুনের (১৭)। একই মাসে চৌগাছায় আরেকটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই কিশোরীর মৃত্যু হয়।
১৯ অক্টোবর ঝিকরগাছার মাগুরা ইউনিয়নের ফুলতলা এলাকায় ভ্যানের সঙ্গে গরুবোঝাই নসিমনের সংঘর্ষে প্রাণ হারায় একই পরিবারের দুই শিশু—শোভন (১০) ও দিশা (৩)। পূজা দেখতে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পরিবারটি। এতে তাদের কলেজশিক্ষক বাবা সাধন কুমার, মা, নসিমনের চালক ও একজন যাত্রী আহত হন।
মাসের শুরু থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২ অক্টোবর চৌগাছা-কোটচাঁদপুর সড়কের দেবীপুর বালিগর্ত এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলে সোলাইমান হোসেন (১৬) মারা যায়। আহত হয় তানজিল হোসেন (১৪) ও ফরহাদ রেজা। জানা যায়, সাতটি মোটরসাইকেলে কয়েকজন বন্ধু ঘুরতে বের হয়েছিল। এর মধ্যে একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়।
৪ অক্টোবর চৌগাছা-মহেশপুর সড়কের ফাসতলায় পিকআপের ধাক্কায় স্কুলছাত্র জুবায়ের হোসেনের (১৫) মৃত্যু হয়। আহত হয় তার দুই বন্ধু লিখন ও ফাহিম। একই দিনে যশোর সদর উপজেলার বারীনগর বাজারে বাসের ধাক্কায় শওকত আলী এবং পুলেরহাটে বাসের আঘাতে বাইসাইকেল আরোহী সুলতান (৬০) প্রাণ হারান। বাঘারপাড়ার জামদিয়ায় দুই ট্রাকের সংঘর্ষে একটি ট্রাক খাদে পড়ে চালক ও সহকারী আহত হন।
৬ অক্টোবর শার্শার নাভারণ-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খাজুরা মসজিদের সামনে পিকআপ গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেলে হেলপার আরিফ হোসেন (৩০) নিহত হন। ১০ অক্টোবর যশোর সদর উপজেলার কচুয়ায় বাড়ির সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় ইঞ্জিনচালিত ভ্যানের ধাক্কায় আহত শিশু সাজিদ (৬) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ১৩ অক্টোবর চৌগাছা বাজারে ট্রাকের আঘাতে গুরুতর আহত নুরুল আলম (৬০) পরে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
এ ছাড়া ১ অক্টোবর দিবাগত রাতে যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা-কামালপুর কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি ট্রাক মসজিদের দেয়াল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় সড়কের পাশে ঘুমিয়ে থাকা অজ্ঞাত এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন ট্রাকচালক।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আহসান কবীর বাপ্পীর মতে, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে তরুণদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তার পর্যবেক্ষণে, ট্রাফিক আইন অমান্য, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং সড়কের অবস্থা দুর্ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি জানান, গুরুতর আহতদের অনেকের মাথায় আঘাত থাকে। কিছু রোগীকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত ঘোষণা করতে হয়। যাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত সেবার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিউরোসার্জারি বিভাগ না থাকায় মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। সার্জারি ও অর্থোপেডিকস বিভাগের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। শহরতলির চাঁচড়া এলাকায় সাম্প্রতিক দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি এ ধরনের রোগীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
দুর্ঘটনা কমাতে অবকাঠামোগত উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি বলে মনে করেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী শাম্মী সুলতানা। তাঁর মতে, সওজ, বিআরটিএ, বিআরটিসি, হাইওয়ে পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
শাম্মী সুলতানা জানান, সড়কে সংকেত, ট্রাফিক সাইন ও গতি নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো স্থাপনের দায়িত্ব সওজের। যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স যাচাই করে বিআরটিএ। চালকদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত বিআরটিসি এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করে হাইওয়ে ও ট্রাফিক পুলিশ। এসব কাজের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করাও প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার স্থান ও ধরন বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। যশোর-মাগুরা সড়কের সওজের আওতাধীন প্রায় সাত কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত বসানো হবে।
বিআরটিএ যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ জমির হোসেন বলেন, সড়কে চলাচলের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। বিশেষ করে সন্তানদের মোটরসাইকেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, চালানোর দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জ্ঞান নিশ্চিত করতে হবে।
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে তিনজনের মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, একটি মোটরসাইকেলে তিনজনের অবস্থান এবং অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, দ্রুতগতিতে চলার সময় হঠাৎ কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে চালকের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম জানান, ফিটনেসবিহীন ও নিবন্ধনহীন যানবাহন, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো এবং হেলমেট ব্যবহার না করার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে দুর্ঘটনা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়; চালক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সড়কে বাস, ট্রাক, মিনিবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ায় যানবাহনের চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে। কম বয়সী ও অনভিজ্ঞ চালকদের দ্রুতগতিতে মোটরসাইকেল চালানো, ঝুঁকি নিয়ে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম করা এবং তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার প্রবণতা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে ফাঁকা সড়ক ও মোড়ের কাছাকাছি এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া এবং বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করার কারণে প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটছে।




