মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। কিন্তু বরিশালের হিজলা উপজেলার মেঘনা নদী ও শাখা নদীগুলোতে ইলিশ শিকার এবং বেচাকেনা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে। নদীর দুর্গম চর ও মোহনায় মাছ ধরে অস্থায়ী বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। পরে নৌযান ও ট্রলারে এসব মাছ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
গত বুধবার সকালে হিজলার বাউশিয়া লঞ্চঘাট, পুরোনো হিজলা নদীর পাড়, দুর্গাপুর, হরিনাথপুর ও আবুপুর এলাকায় কয়েকটি অস্থায়ী বাজারে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অভিযানকারী দলের ওপর হামলা
গত ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ ধরা, বিক্রি ও পরিবহনে বিধিনিষেধ রয়েছে। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা এবং এর শাখা নদীর বিভিন্ন অংশ ইলিশের অভয়াশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। তবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর অভিযানকারী দলের ওপর অন্তত দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে।
নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিনে হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকল বাজারের কাছে সাত নম্বর ঘাটসংলগ্ন মেঘনায় অভিযান চালাতে গিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন। গত বৃহস্পতিবার আরেকটি অভিযানকারী দলের ওপর হামলার সময় এক শ্রমিকের মাথায় ইটের আঘাতে গুরুতর জখম হয়।
স্থানীয়দের দাবি, জানপুর, খালিশপুর, চরকিল্লা ও আবুপুর এলাকায় নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ শিকারের তৎপরতা বেশি। অভিযানের খবর পেলে দ্রুত পালানোর জন্য কিছু ট্রলারে দুই থেকে তিনটি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে এসব নৌযান ‘ফাইটার’ নামে পরিচিত। অভিযান ঠেকাতে ইট-পাথর, বাঁশ, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
আট ঘাট ঘিরে বড় বাণিজ্য
স্থানীয় জেলে ও ঘাটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কয়েকটি এলাকার ঘাটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হয়। আবুপুরের অস্থায়ী বাজারে বেচাকেনা হয় আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ। শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অন্তত ২৫০ জন পাইকার এসব বাজারে আসেন বলে সংশ্লিষ্ট এক প্রতিনিধি জানিয়েছেন। ঘাটে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জেলেদের দাবি, ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ইলিশ ধরা পড়ে। বড় ট্রলারে এক দিনে মাছের মূল্য দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। জানপুর এলাকায় অন্তত ২০টি মাছঘাট রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কালাবদর, গজারিয়া ও মেঘনা নদীর কয়েকটি অংশ নিয়ে এই অঞ্চলে ইলিশের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ঘাট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ
স্থানীয় জেলে, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের একাংশের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কয়েকটি ঘাটের নিয়ন্ত্রণ বদলেছে। আগে এসব ঘাটের নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন বলে দাবি করা হয়। পরে বিএনপির কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে ঘাটগুলো চলে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা অবৈধ ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার আগেই ঘাট বন্ধ করা হয়েছে।
হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বিস্তীর্ণ নদী এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য বরাদ্দ মাত্র দেড় লাখ টাকা। এই অর্থে তিন থেকে চার দিনের বেশি অভিযান চালানো কঠিন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানও বরাদ্দ ও জনবলস্বল্পতার কথা স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, প্রতিদিন অভিযান চললেও বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় ট্রলারের তুলনায় জনবল পর্যাপ্ত নয়।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একটি বড় চক্র ইলিশ শিকার করছে। কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালানো হলেও দুর্গম এলাকা, জনবলস্বল্পতা ও জেলেদের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে রাতে অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌবাহিনীকে যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও এর মধ্যেই কোটি কোটি টাকার মাছ কেনাবেচার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ শিকার বন্ধ করতে নদীতে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি ঘাটকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।




