রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে নবম দিনের মতো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে অবরোধের সমর্থনে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন দেন অবরোধকারীরা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল দিচ্ছে।
সাজেকে মারাত্মক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে। সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় একদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক পর্যটন খাত, অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের বেশ কিছু দুর্গম গ্রামে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের পাশাপাশি তীব্র ওষুধ সংকটের আশংকা করা হচ্ছে।
এদিকে, রাঙ্গামাটির বাঘাইহাট জোনের সেনা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বৃহস্পতিবার দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে সেনা ক্যাম্প পরিদর্শনের অংশ হিসেবে তিনি বাঘাইহাট জোনে যান। রাতে সেনাবাহিনীর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্যাম্প পরিদর্শনকালে সেনাপ্রধান মোতায়েনরত সেনাসদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি প্রতিক‚ল পরিবেশ ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সেনাসদস্যদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি, তিনি সকলকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অর্পিত কর্তব্য পালন অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করেন। সফরকালে, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ইন চিফ; জেনারেল অফিসার কমান্ডিং, ২৪ পদাতিক ডিভিশন ও এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়া; সেনাসদর ও সংশ্লিষ্ট এরিয়ার ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সেনাসদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
পাঁচ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন।
তাদের করা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২২ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত; উজোবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং সেখান থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার; হামলায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ; সাজেক থেকে জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রæপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা; পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও বাড়িঘর- ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধ করা।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাঙ্গামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অবরোধকারী এবং দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জেএসএস সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে প্রত্যাহার, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের দেওয়া পূর্বের আশ্বাস বাস্তবায়নের দাবিতে গত ১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখা হয়। পরে সংগঠন দুটি ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয়।
অবরোধের সাজেক ভ্যালিতে ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েন। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়ি বহরকে নিরাপত্তা দিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে রওনা হয়। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়টি সাজেকের উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারী ও পিকেটাররা সড়কে ব্যারিকেড ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে তাদের পথরোধ করে। দীর্ঘ সময় আলোচনার পরও অবরোধকারীরা পথ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
রাঙ্গামাটির সাজেক সংকট পাহাড়ের দুই এমপির মধ্যস্থতায় নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও একটি দাবী নিয়ে কোন সমঝোতা না হওয়ায় সাজেক সংকট এখনো কাটেনি। তবে উভয়পক্ষই আশাবাদী খুব শীঘ্রই এ সংকট লাঘব হয়ে আবারো পাহাড় জুড়ে স্বস্তি ফিরে আসবে।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) বেলা তিনটা থেকে বিকেল পৌনে ছয়টা পর্যন্ত সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভ‚ঁইয়া ও রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য সাবেক পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তবে আন্দোলনকারীদের ৫ দফা দাবির মধ্যে চারটি নিয়ে দুই পক্ষই সম্মত হলেও চার নম্বর দফায় আটকে যায় আলোচনা। তবে প্রধান দাবি-সাজেক এলাকা থেকে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেয়ার বিষয়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অবরোধ প্রত্যাহারের পথও তৈরি হয়নি।
এ ব্যাপারে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম জানান, বর্তমানে এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও পুলিশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।