আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত জারি গান। সেই পুরোনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অনুষ্ঠিত হয়েছে জারি গানের বিশাল আসর। এতে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ত্রিশাল উপজেলার ৫ নম্বর রামপুর ইউনিয়নের কাকচর পশ্চিমপাড়া আদর্শ বাজারে স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। এতে ১৩টি দল অংশ নেয়। গানের সুর, আবেগঘন পরিবেশনা ও প্রতিযোগীদের উপস্থাপনায় মুগ্ধ হন দর্শকরা।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি বড় ষাঁড়, দ্বিতীয় পুরস্কার একটি মাঝারি আকারের ষাঁড় এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় একটি খাসি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান খোকন। উদ্বোধন করেন ৫ নম্বর রামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আপেল মাহমুদ। সভাপতিত্ব করেন গফরগাঁও পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. সানোয়ার হোসেন কাজল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. মনিরুজ্জামান খোকন বলেন, জারি গানসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সুস্থ বিনোদনের এসব মাধ্যমের চর্চা কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির ঝুঁকিতে পড়ছে। তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, গান ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। এ ধরনের আয়োজন তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করবে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষের উপস্থিতি জারি গানের প্রতি আগ্রহের প্রমাণ।
আয়োজনে আসা স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় গ্রামবাংলায় নিয়মিত জারি গানের আসর বসত। সময়ের পরিবর্তনে এ ধরনের আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। কাকচর পশ্চিমপাড়া আদর্শ বাজারে এমন আয়োজন দেখতে পেরে তারা আনন্দিত। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা।
স্থানীয়দের মতে, আসরে সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গানের পরিবেশনা ঘিরে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন হলে নতুন প্রজন্ম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
জারি গান মূলত কারবালার মর্মান্তিক যুদ্ধ এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের বেদনাবিধুর কাহিনিকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। আবেগঘন সুর, বিলাপধর্মী পরিবেশনা ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে এ গানে ফুটে ওঠে শোক, ত্যাগ ও মানবতার নানা দিক। সময়ের সঙ্গে এতে যুক্ত হয়েছে সামাজিক ঘটনা ও জনজীবনের নানা চিত্র।
বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এই লোকসংগীত দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কাকচর পশ্চিমপাড়ার এ আয়োজন নিয়মিত হবে এবং হারিয়ে যেতে বসা জারি গান আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।