বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এস এম সুলতান এক স্বতন্ত্র নাম। গ্রামীণ জনজীবন, কৃষকের শ্রম ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে তিনি যেভাবে ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন, তা তাঁকে দেশ-বিদেশে পরিচিতি এনে দিয়েছে। আজ ১০ অক্টোবর তাঁর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে তাঁর সমাধি।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল ঝোঁক। ১৯৩৮ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে শিল্পশিক্ষা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি। নিজের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও শিল্পভাবনাকে অবলম্বন করে গড়ে তোলেন স্বতন্ত্র শিল্পভাষা।
শিল্পী হিসেবে তাঁর পথচলা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রকফেলার বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি বিভিন্ন শহরে শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ পান। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, বোস্টন ও শিকাগোতে প্রদর্শিত হয় তাঁর কাজ। তবে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি অর্জন করলেও বাংলার গ্রামীণ জীবনই ছিল তাঁর শিল্পের প্রধান অনুপ্রেরণা।
সুলতানের শিল্পকর্মে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের অবয়ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পেশিবহুল দেহ, দৃঢ় ভঙ্গি ও কর্মক্ষমতার প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি কৃষকের শক্তি এবং সমাজে তাঁদের অবদানকে তুলে ধরেছেন। তাঁর কাছে কৃষক কেবল ছবির চরিত্র নন; তাঁরা উৎপাদন, জীবন ও সভ্যতার অন্যতম প্রধান শক্তি। ‘ধান কাটা’, ‘পাট কাটা’, ‘চর দখল’, ‘কৃষকের সংগ্রাম’ ও ‘আমার গ্রাম’ তাঁর আলোচিত কাজ।
শিশুদের সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশেও তিনি উদ্যোগী ছিলেন। নড়াইলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শিশুস্বর্গ’, যেখানে শিশুদের ছবি আঁকার সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেন। তাঁর স্মৃতি ও শিল্পকর্ম সংরক্ষণের জন্য চিত্রা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুলতান কমপ্লেক্স।
শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এস এম সুলতান একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর শিল্পকর্ম আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষক, মাটি ও গ্রামীণ জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি যে শিল্পদর্শন রেখে গেছেন, তা নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও দর্শকদের জন্যও প্রেরণার উৎস।