দেশের কৃষি গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) উদ্ভাবিত ন্যানো ইউরিয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ২৫ অক্টোবর সারটির মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস। গবেষকদের প্রত্যাশা, উদ্ভাবিত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আমদানি করা সারের ওপর নির্ভরতাও হ্রাস পাবে।
এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক যবিপ্রবির কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যানো-বায়ো অ্যান্ড অ্যাডভান্সড মেটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবে তাঁর নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ২০২১ সালে পেটেন্টের আবেদন করার পর দীর্ঘ কারিগরি ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বীকৃতি মিলেছে।
পাতায় প্রয়োগে সাশ্রয়ের সম্ভাবনা
প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে সারের উল্লেখযোগ্য অংশ গাছের কাজে লাগে না। গবেষকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাটিতে প্রয়োগ করা ইউরিয়ার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয়ে যায়। ফলে উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণের কার্যকারিতা অনেকটাই সীমিত থাকে।
নতুন প্রযুক্তিতে তরল সার স্প্রে করার মাধ্যমে সরাসরি উদ্ভিদের পাতায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এর অতি ক্ষুদ্র কণা পাতার রন্ধ্র দিয়ে শোষিত হতে পারে। উদ্ভাবকের দাবি, এ পদ্ধতিতে সারের কার্যকারিতা ৯০ শতাংশের বেশি হতে পারে।
গবেষণায় উপস্থাপিত অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে এক বিঘা জমিতে ইউরিয়া ব্যবহারে প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা ব্যয় হলেও ন্যানো ইউরিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে মাত্র ২৩০ টাকা। একই বা উন্নত ফলন পাওয়া গেলে কৃষকের সার কেনার খরচ প্রায় ৯৫ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ হিসাবের বাস্তব ফলন ও ব্যয় বাণিজ্যিক পর্যায়ে আরও যাচাই করা প্রয়োজন।
আমদানি ব্যয় কমানোর সুযোগ
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া ব্যবহৃত হয়। এর বড় অংশ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে সার আমদানির পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকি বাবদও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
দেশীয় ন্যানো ইউরিয়া প্রযুক্তির ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব হলে এই ব্যয়ের ওপর চাপ কমতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রচলিত ইউরিয়ার বিকল্প হিসেবে এটি কতটা ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার ফল ও কৃষি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর।
পরিবেশবান্ধব কৃষিতেও গুরুত্ব
কৃষিজমিতে অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে মাটি ও পানিতে নাইট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি নাইট্রাস অক্সাইডের মতো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়।
গবেষকদের মতে, পাতায় সরাসরি সার প্রয়োগের প্রযুক্তি নাইট্রোজেনের অপচয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। এতে মাটির নিচে সার চুইয়ে পড়া এবং পানিদূষণের ঝুঁকিও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দেশে-বিদেশে পরীক্ষার উদ্যোগ
যবিপ্রবির গবেষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আব্দুলপুর, বগুড়ার শেরপুর ও গাজীপুরে বিভিন্ন ফসলের ওপর ন্যানো ইউরিয়ার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রেও প্রযুক্তিটির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মার্কিন জৈবসার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোলাবায়োর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার চুক্তিও হয়েছে।
গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনের অপেক্ষা
পেটেন্ট পাওয়ার পর এখন প্রযুক্তিটিকে শিল্প পর্যায়ে নেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য সরকারি সার কারখানা কিংবা বেসরকারি কৃষি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে কৃষকদের নতুন সার ব্যবহারের নিয়ম শেখানো, উৎপাদনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ফসলভেদে প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে প্রযুক্তিটির সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে।
যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর এই অর্জনকে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের জন্য গর্বের বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, উদ্ভাবনটি কৃষি উৎপাদন ব্যয় এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান মনে করেন, কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। তাঁর গবেষণার এই স্বীকৃতি এখন কত দ্রুত বাস্তব কৃষি উৎপাদনে কাজে লাগে, সেটিই হয়ে উঠেছে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।