নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, গণহত্যার বিচার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সুরক্ষায় অবদানের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তার জীবন ও কর্মের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের মর্যাদা, আইনের শাসন এবং অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন পিল্লাই। ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে বেড়ে ওঠার সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন। সেই পরিবেশ তাকে মানুষের অধিকার ও সমতার প্রশ্নে সচেতন করে তোলে। আইন পেশায় প্রবেশের পর তিনি বৈষম্যের শিকার মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬৭ সালে নিজস্ব আইনচর্চা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলছিল। পিল্লাই তার পেশাগত জীবনে অধিকারবঞ্চিত মানুষের আইনি সহায়তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন।
পরবর্তী সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হন। একই বছর রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার করতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে যোগ দেন। এটি ছিল তার কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে পিল্লাইয়ের ভূমিকা আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশে বিশেষভাবে আলোচিত। জঁ-পল আকায়েসুর মামলায় ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক রায়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার পথ সুস্পষ্ট হয়। এর ফলে সংঘাতের সময় নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার বিচারিক স্বীকৃতি আরও শক্তিশালী হয়।
২০০৩ সালে তিনি ওই ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হন। এরপর ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণ ও জাতিগত বৈষম্য, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের সুরক্ষার বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেন।
জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের পরও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে তার কাজ থেমে থাকেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুক্ত থাকার পাশাপাশি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের অ্যাডহক বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই মামলা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ এবং গণহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রগুলোর আইনি দায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পিল্লাইয়ের কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি মানবাধিকারকে কেবল নীতিগত ঘোষণা হিসেবে দেখেননি; বরং বাস্তবে তা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার কাছে ন্যায়বিচার মানে অপরাধের বিচার, ভুক্তভোগীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতাবানদেরও আইনের আওতায় আনা।
বর্ণবৈষম্যের সমাজে জন্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নাভি পিল্লাইয়ের জীবন প্রমাণ করে, প্রতিকূল সামাজিক বাস্তবতা অতিক্রম করে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখা সম্ভব। তার কর্মজীবন আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।