ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। নতুন সমঝোতা অনুযায়ী, দক্ষিণ ইয়েমেনে হুতিবিরোধী সরকারপন্থী বাহিনীকে অর্থায়ন করবে আমিরাত। আর এসব বাহিনীকে আকাশপথে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেবে সৌদি আরব। দুই দেশের এ উদ্যোগে দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম *দ্য গার্ডিয়ান* শনিবার (১৭ অক্টোবর) ইয়েমেনের একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে।
মতপার্থক্য পেছনে রেখে সহযোগিতা
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ ও দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৌদি আরব এবং আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সৌদি আরবের সঙ্গে বিরোধের পর আমিরাত হুতিবিরোধী সামরিক তৎপরতা থেকে সরে দাঁড়ায় এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট ‘জায়ান্ট ব্রিগেডস’ বাহিনীর অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়।
এদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি তুলেছে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন পৃথক রাষ্ট্র ছিল। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের স্বাধীনতার দাবি নতুন করে দেশটির বিভক্তির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এসটিসি নেতা আইদারুস আল-জুবাইদি গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ও স্বাধীনতার পক্ষে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগে ব্যর্থ হন। পরে তিনি আবুধাবিতে চলে যান। এরপর এসটিসির জন্য পাঠানো অস্ত্রের একটি চালানে সৌদি আরব হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইয়েমেন থেকে সব ধরনের কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় আমিরাত।
গুরুত্বপূর্ণ শহরে হুতিদের হামলা
ইয়েমেনের তাইজ ও মারিব শহর দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হুতি বিদ্রোহীরা। গত শুক্রবার এডেন বিমানবন্দর লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের কাছাকাছি পড়ে। তবে এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এর আগের দিন এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলায় পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন।
অন্যদিকে, রাজধানী সানা থেকে হুতিদের হটাতে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার। তবে মারিবের কাছে মাজজার এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি এলাকায় সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি সীমিত রয়েছে।
সৌদি আরবের পাশে মিসর ও যুক্তরাজ্য
সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহায়তার জন্য মিসরের সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডাকার কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। তবে তিনি বলেছেন, মিসর আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে না; বরং সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে।
সৌদি আরব যুক্তরাজ্যের কাছেও সামরিক সহায়তা চেয়েছে। এরই মধ্যে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি আরএএফ ভয়েজার উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছে। ওমান ও কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানে যুক্তরাজ্যের আরও সহায়তা দেওয়ার আইনি দিক নিয়েও আলোচনা চলছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত বলেছিলেন, ইয়েমেনে সৌদি হামলার সময় অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকার বেআইনি পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল। পরে সরকার অস্ত্র রপ্তানির মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনে।
সৌদি আরবের দাবি, তাদের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে। গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক বিবৃতিতেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়।
বাস্তুচ্যুত দুই লাখের বেশি
ইয়েমেনে আগস্ট থেকে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে দেশটির মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ওপর চাপ বেড়েছে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের নতুন সামরিক সহযোগিতা হুতিদের অগ্রযাত্রা কতটা ঠেকাতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এই সমঝোতা কার্যকর হলে ইয়েমেনের সামরিক পরিস্থিতি এবং দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ—দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসতে পারে।




