ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার পর সৌদি আরবের কয়েকটি বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে যেতে চাওয়া হাজারো যাত্রী। রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় অনেকে বিকল্প টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ বাড়তি টাকা দিয়ে অন্য রুটে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন। আবার ফ্লাইট বাতিলের খবর না জেনে বিমানবন্দরে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াদ ও দাম্মামের পরিবর্তে জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিকল্প ফ্লাইটে আসন সংকট, টিকিটের গন্তব্য পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ভোগান্তি কমছে না। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা প্রবাসী শ্রমিক ও নতুন করে সৌদি আরবে কাজে যেতে চাওয়া ব্যক্তিরা পড়েছেন বেশি সমস্যায়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ১৪ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও সংযোগকারী পথে চলাচলকারী ১০০টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন ১৫ হাজার ৩৯৩ জন যাত্রী। বাতিল বা স্থগিত ফ্লাইটের মধ্যে ৪১টি সরাসরি এবং ৫৯টি সংযোগকারী ফ্লাইট ছিল।
সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলার ১০টি, সৌদিয়ার সাতটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে। সংযোগকারী ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, সালাম এয়ারের সাতটি, কাতার এয়ারওয়েজের সাতটি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার দুটি এবং ইজিপ্ট এয়ারের একটি ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটে।
১৫ অক্টোবরের হালনাগাদ হিসাবে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্নের সংখ্যা বেড়ে ১০৩টিতে দাঁড়ায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীর সংখ্যা হয় ১৫ হাজার ৭৭৯। এটি আগের দিনের তুলনায় বেশি; দুই দিনের হিসাবকে একই সময়ের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের ফ্লাইট ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিকল্প হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জেদ্দা ও মদিনা রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। টিকিট ও আসন পাওয়া সাপেক্ষে রিয়াদ ও দাম্মামের যাত্রীদের এসব গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে বিকল্প পথে কতজন যাত্রী ইতিমধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছেছেন, তার নিশ্চিত সংখ্যা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিকল্প বিমানবন্দরে পৌঁছালেও মূল গন্তব্যে যেতে বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হতে পারে। রিয়াদ বা দাম্মামে কর্মরত যাত্রীদের জেদ্দা কিংবা মদিনা থেকে সড়কপথে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হতে পারে। পাশাপাশি এসব রুটের ফ্লাইটে আগে থেকেই বুকিং থাকায় সবার জন্য আসন নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বগুড়ার আনোয়ার হোসেনের ১৩ অক্টোবর বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে ইন্ডিগোর ফ্লাইটে ঢাকা থেকে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। শ্রমিক ভিসায় প্রথমবার সৌদি আরবে যেতে চাওয়া এই যাত্রীর ফ্লাইট বাতিল হয়। রাত পর্যন্ত বিমানবন্দরে অপেক্ষা করে তিনি বাইপাইলে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। পরদিন টিকিটের এজেন্সি ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি। নতুন করে টিকিট কাটতে বাড়তি টাকা লাগতে পারে—এ নিয়ে উদ্বেগে পড়েন তিনি।
অন্যদিকে, তিন মাসের ছুটি শেষে রিয়াদে কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল জাকির হোসেনের। ১৩ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর ১৬ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে মদিনাগামী ফ্লাইটের টিকিট নেন তিনি। রিয়াদের একটি কারখানায় কর্মরত জাকিরের ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ায় দ্রুত কাজে ফেরার প্রয়োজন ছিল।
ফ্লাইট বাতিলের প্রভাব পড়েছে ওমরাহযাত্রীদের ওপরও। আতিয়ার রহমান ও সুজাউদ্দিনসহ ৪০ জনের একটি দলের বুধবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে এয়ার এরাবিয়ার ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রা বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে যেতে পারেননি তারা। এতে হোটেলে থাকা ও অন্যান্য খাতে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে আসা রিয়াদগামী যাত্রী কবির আবদুল হাইয়েরও বুধবার রাত ১২টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট বাতিলের পর তিনি টিকিট পরিবর্তনের জন্য বলাকা কার্যালয়ে যান। বৃহস্পতিবার ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা থাকায় দ্রুত বিকল্প ফ্লাইট পাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
১৪ অক্টোবর ঢাকার বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকে ফ্লাইট বাতিলের খবর আগে থেকে পাননি। ফলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে বিমানবন্দরে এসে যাত্রা স্থগিতের কথা জানতে পারেন। কেউ বিকল্প ফ্লাইটের অপেক্ষায় ছিলেন, কেউ টিকিটের তারিখ পরিবর্তনের জন্য বিমান সংস্থার কার্যালয়ে যান।
বেবিচক এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের সহায়তা ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য বিমান সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল। তবে যাত্রীদের অনেককেই নিজেদের উদ্যোগে পরবর্তী যাত্রার ব্যবস্থা খুঁজতে দেখা যায়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মকর্তা জানান, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি, তাদের বিনা মূল্যে টিকিট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিকল্প ফ্লাইটে আসন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গন্তব্য পরিবর্তন, নতুন রুটের ভাড়া ও টিকিটের শর্ত অনুযায়ী কোনো কোনো যাত্রীকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতে পারে। চাহিদার তুলনায় আসন কম থাকায় কয়েকজনকে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পরও ফিরিয়ে আনার ঘটনা ঘটেছে; পরে পরবর্তী ফ্লাইটে তাদের পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পরিস্থিতির সব দিক এখনো স্পষ্ট নয়। বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত পরিস্থিতি বিবেচনায় বিমান সংস্থাগুলোকে ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের অবস্থা, বিকল্প রুট ও টিকিটের শর্ত নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। তাই ফ্লাইট চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত থাকলে নতুন কর্মী পাঠানো, ছুটি শেষে প্রবাসীদের কর্মস্থলে ফেরা এবং কর্মসংস্থানের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। আটকে পড়া যাত্রীদের দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অতিরিক্ত ব্যয় কমানো এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।