ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের অসন্তোষ রাজপথে বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন এলাকায় জেন-জি প্রজন্মের তরুণেরা প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হলেও কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
স্বাধীন গবেষণা সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) প্রকল্পের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ভারতে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভের ঘটনা ঘটতে পারে। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ এবং তরুণদের আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে ওঠাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদির জন্য তরুণদের আন্দোলন ও বিরোধীদের প্রতি বাড়তে থাকা সমর্থন বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সীদের অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তবে বিক্ষোভ বাড়লেও সরকার এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের কর্মী যোগেন্দ্র যাদবের ভাষায়, দেশ যেন হঠাৎ করেই নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে। তবে তিনি মনে করেন না, এই আন্দোলনই মোদি সরকারের পতনের সূচনা। তার মতে, এটি সরকারের ক্রমাবনতির সূচনা হতে পারে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও ভারত সরকার ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সাড়া দেয়নি।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম কারণ নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এ প্রক্রিয়ায় বিজেপি সুবিধা পাচ্ছে এবং কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে দলটির জয়ের পথ সহজ হয়েছে। এ কারণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন বিক্ষোভকারীরা।
বিজেপি, কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিজেপির দাবি, মোদির জনপ্রিয়তা ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দলটির নির্বাচনী সাফল্যের প্রধান কারণ।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের অভাব, নিয়োগ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং প্রভাবশালী ধনকুবের ব্যবসায়ীদের ভূমিকা নিয়েও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অনন্যা রাতুরি সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, তরুণদের মধ্যে এখন আর আগের মতো ভয় নেই। পুলিশের হাতে আটক হওয়ার আশঙ্কাও তাদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখতে পারছে না বলে জানান তিনি। তবে বিক্ষোভকারীদের মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ বলেছে, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই তাদের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আন্দোলন
মোদির শাসনামলে তরুণদের নেতৃত্বে আলোচনায় এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের একটি উদ্যোগ। ভারতের প্রধান বিচারপতির বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ হিসেবে তুলনা করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ থেকে এর সূত্রপাত। পরে কর্মসংস্থান, সুযোগের অভাব ও রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবিতে তরুণদের একটি অংশ এতে যুক্ত হয়।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ বিক্ষোভের খবর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে না। তবে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও এবং ইউটিউবভিত্তিক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়ছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং বামপন্থী আন্দোলনকর্মী নেহা বোরার মতো ব্যক্তিরাও অনলাইনে পরিচিতি পেয়েছেন।
এদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তার সমর্থকেরাও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। ভারতের আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশ ও নেপালের তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত সাম্প্রতিক আন্দোলনের তুলনা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে দেশটির পরিস্থিতিকে সরাসরি ওই দুই দেশের সঙ্গে মেলানো যায় না।
বেকারত্ব ও শিক্ষায় অনিয়মের ক্ষোভ
মোদির উত্থানের সময় অনেক তরুণ কর্মসংস্থান, উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রত্যাশায় তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু এক দশক পরও তাদের অনেকের অভিযোগ, প্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি হয়নি। সরকারের দাবি, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে অর্থনীতিতে ১৬ কোটি ৮৩ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। মোদি ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার সরকার সব ভারতীয়র জন্য কাজ করে।
তবে তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদনে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের প্রতি পাঁচজনের একজন কর্মহীন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। গত মে মাসে জাতীয় মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তির পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। পরীক্ষা ও ফল নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের পর অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সমাজকর্মী রুবি সিংয়ের মতে, বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তরুণদের মধ্যে পড়াশোনা করেও যোগ্য সুযোগ না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সামনে রাজনৈতিক পরীক্ষা
ভারতের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়। তবে আগামী বছরের শুরুর দিকে উত্তর প্রদেশে নির্বাচন হওয়ার কথা, যা বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হতে পারে।
নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক রাহুল ভার্মার মতে, কয়েক মাস আগের তুলনায় বিজেপি কিছুটা দুর্বল হয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান বিক্ষোভ নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
কর্মসংস্থান, পরীক্ষায় অনিয়ম, ভোটার তালিকা সংশোধন ও সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ ভারতের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এই আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে কী প্রভাব ফেলে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের পরিস্থিতির ওপর।




