ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তিনি। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অপারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বম্বস’ বা এমওএবি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে বোমাটি ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় আবারও হামলার প্রয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। বিশেষ করে নাতাঞ্জের কাছে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় পাহাড়ের গভীরে থাকা স্থাপনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কী এই এমওএবি
এমওএবির আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট। প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এই বোমায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রচলিত বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। এর দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের বেশি। আকার ও ওজনের কারণে এটি সাধারণ যুদ্ধবিমানের বদলে সি-১৩০ হারকিউলিসের মতো বড় পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপ করা হয়।
বোমাটি ভূপৃষ্ঠের কিছুটা ওপরে বিস্ফোরিত হয়ে বিস্তৃত এলাকায় প্রচণ্ড চাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারে। তবে বড় বিস্ফোরণ ঘটানোর ক্ষমতা থাকলেই পাহাড়ের গভীরে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্মুক্ত স্থাপনা ও ভূপৃষ্ঠের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এটি ব্যাপক ক্ষতি ঘটাতে পারলেও গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার শঙ্কা
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার নির্দেশ দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এমওএবি ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনটির তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উত্তেজনার সময় ট্রাম্প ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সমঝোতা না হলে একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে—এমন বক্তব্যের পাশাপাশি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি। এসব বক্তব্যের পর পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় আসে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। সামরিক শক্তি প্রয়োগ কিংবা কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাত দ্রুত শেষ করার কথা বলেছেন তিনি। তবে ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন।
ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর কারণে স্থল অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। দেশটির মাটির নিচে থাকা বলে ধারণা করা প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করার সম্ভাবনা নিয়েও আগে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এমন অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, তা স্পষ্ট নয়।
পারমাণবিক বোমা নয়, তবু ভয়াবহ
এমওএবি পারমাণবিক বোমা নয়। এতে প্রচলিত বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র তুলনামূলক সীমিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও তা ব্যাপক প্রাণহানি ও তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটাতে পারে। তাই দুই ধরনের অস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কোনোটির ব্যবহারই সংঘাতের ঝুঁকিমুক্ত নয়।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের হামলা হলে তেহরানও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। দেশটি এর আগে সংঘাত বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযান শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করলেও ইরানে বড় ধরনের প্রচলিত অস্ত্রের হামলার পথ বন্ধ করেননি। এমওএবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আর এই বোমা ব্যবহার করলেও ইরানের গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।