ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছেছেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। দেশত্যাগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তিনি দাবি করেছেন, ব্রাজিল থেকে পালিয়ে যাননি; বরং দেশের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যে ফ্লাভিও বলেন, নিজ দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা তার ছিল না। তবে ব্রাজিলের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে দেশের মানুষের জন্য নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি সরে এসেছেন বলে দাবি করেন।
ব্রাজিলে তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছেন এই রাজনীতিক। নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার দাবি করে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রাজিলের আদালত তদন্তের অংশ হিসেবে ফ্লাভিওর পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা না দেওয়ায় কর্তৃপক্ষ তার পাসপোর্ট বাতিল করে। এর পরই তার অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরে তাঁকে ও তার পরিবারের সদস্যদের ভিসা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফ্লাভিওর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতির বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। অন্যদিকে, ব্রাজিলের পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তার গোপনে দেশ ছাড়ার সমালোচনা করে বলেছেন, যাঁদের লুকানোর কিছু নেই, তাঁদের ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।
যেভাবে পৌঁছালেন ফ্লোরিডায়
ফ্লাভিওর অবস্থান নিয়ে কয়েক দিন ধরে অনিশ্চয়তা চলার পর তার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর খবর নিশ্চিত হয়। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, তিনি মঙ্গলবার রাতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্থলপথে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করেন। পরে একটি ব্যক্তিগত বিমানে ইকুয়েডরের গুয়ায়াকিল হয়ে বুধবার সকালে মায়ামি এলাকায় পৌঁছান।
দেশ ছাড়ার আগে তার অবস্থান সম্পর্কে ব্রাজিলের কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে পারেনি। পাসপোর্ট জমা দেওয়ার আদালতের নির্দেশ অমান্য করার বিষয়টি সামনে আসার পর তার দেশত্যাগ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত পর্বে লুলা দা সিলভার কাছে পরাজিত হন ফ্লাভিও। লুলা চার মিলিয়নেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। নির্বাচনের ফল দেশটির শীর্ষ নির্বাচনী আদালত নিশ্চিত করে। তবে ফ্লাভিও নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং অনিয়মের অভিযোগ করেছেন; এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারের অন্য সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্রে
ফ্লাভিওর বাবা ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোও ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় চলে গিয়েছিলেন। পরে ব্রাজিলে ফিরে আসেন তিনি। দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যুত্থানচেষ্টাসংক্রান্ত মামলায় জইর বলসোনারো দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
ফ্লাভিওর ছোট ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থান করছেন। বাবার বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে ব্রাজিলের আদালত তাকেও অনুপস্থিতিতে দণ্ড দিয়েছেন।
তদন্ত ও আইনি জটিলতা
ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টে ফ্লাভিওর বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত চলছে। এর একটি তার বাবার জীবনীনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সাত কোটি ডলারের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন নিয়ে। অন্যটি অর্থপাচারের অভিযোগসংক্রান্ত। ফ্লাভিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তদন্ত চলমান থাকলেও তাকে এসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
আগামী ৩১ জানুয়ারি তার সিনেট সদস্যপদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এতে সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া আইনি সুরক্ষা হারাতে পারেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি কত দিন থাকবেন কিংবা পরে ব্রাজিলে ফিরবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: বিবিসি



