দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় সরকার। বিশেষ করে সরকারি খাদ্যগুদামে চাল সংরক্ষণ, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের কার্যকারিতা যাচাই এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংস্থাটির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম এমপি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে ঢাকায় খাদ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে WFP বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে WFP-এর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
সরকারি খাদ্যগুদামে দীর্ঘ সময় ধরে চালের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। এ সমস্যা মোকাবিলায় খাদ্যশস্য সংরক্ষণ ও মজুত ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক নির্দেশিকা এবং স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরিতে WFP-এর কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিতরণ করা পুষ্টিসমৃদ্ধ ও ফর্টিফায়েড চালের বাস্তব উপকারিতা যাচাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। খাদ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০০ উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর পুষ্টিগত প্রভাব পরিমাপ করতে একটি গবেষণা পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি সম্পন্ন করতে আনুমানিক ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ অর্থায়নের পাশাপাশি গবেষণায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে ফর্টিফায়েড চালের সুফল নিশ্চিত হওয়া গেলে কর্মসূচিটির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ ও নীতিনির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
এ ছাড়া চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সংযোজনের জন্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে WFP-এর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় খাদ্য মজুতের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন খাদ্যমন্ত্রী। বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের পাশাপাশি জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুত এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
জবাবে WFP বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনায় খাদ্যশস্যের কৌশলগত মজুত, সামাজিক নিরাপত্তা, পুষ্টিমান উন্নয়ন এবং স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ফর্টিফায়েড চালের কার্যকারিতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগে WFP সম্ভাব্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদেরও যুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এ জন্য একটি বিস্তারিত ধারণাপত্র তৈরির পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত খাদ্যশস্য ব্যবহার করে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি বিস্তারের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে খাদ্য, কৃষি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
উভয় পক্ষ আগামী পাঁচ বছরের সহযোগিতার রূপরেখা তৈরির বিষয়ে আলোচনা করে। ২০২৮ সাল থেকে নতুন অংশীদারত্ব কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনাও উঠে আসে বৈঠকে।
এ সময় খাদ্যসচিব আবু তাহের মোহাম্মদ মাসুদ রানা, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জসীম উদ্দিন খান, WFP বাংলাদেশের সিনিয়র পার্টনারশিপ অ্যাডভাইজার মো. মহসিন চৌধুরী এবং হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, একই দিন বিকেলে খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সঙ্গে সচিবালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। এ সময় দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সাক্ষাতে খাদ্যসচিব, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।