বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিচালনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চর্চার চেয়ে ব্যক্তির প্রভাব বেশি। অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রার্থী বাছাই—বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক অর্থায়নে বিত্তশালী ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা দলগুলোকে ক্রমেই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত বাণিজ্যিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
রোববার ঢাকায় সংস্থাটির কার্যালয়ে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা, অর্থের উৎস, অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, নেতৃত্বের কাঠামো এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণার জন্য ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল টিআইবি। এর মধ্যে ৩২টি দল প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেছে। ২০০৮ সালে দল নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ উপাত্তও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা হিসেবে ঘোষিত আয়ের পরিমাণ তার তুলনায় অনেক কম।
টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, কোনো দল অন্তত ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালালে বছরে সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে ১৪ থেকে ২৫ কোটি টাকা। অথচ সদস্য চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় সর্বোচ্চ ২৬ লাখ টাকা। সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বার্ষিক ব্যয় ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিপরীতে সদস্য চাঁদা থেকে আয় হতে পারে ১৪ থেকে ৩৮ কোটি টাকা।
ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক বিস্তৃতি থাকলে বছরে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫৩২ থেকে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় মাত্র ১১৬ কোটি টাকা। অর্থের এই ব্যবধান পূরণে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। অধিকাংশ দলের আয়-ব্যয় পরিচালনা, অনুদান গ্রহণ, সদস্যদের চাঁদা নির্ধারণ, হিসাব সংরক্ষণ ও নিরীক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। নিয়মিত বাজেট তৈরির চর্চাও অনুপস্থিত। এমনকি দলগুলোর নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে।
নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ দল কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন করলেও গোপন ভোটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। দলীয় প্রধান পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নজিরও খুব বেশি নয়। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দলগুলোর মধ্যে কেবল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও এবি পার্টিতে একাধিক প্রার্থীর প্রতিযোগিতার তথ্য পাওয়া গেছে।
দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্ধারণেও অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে নির্দিষ্ট সীমা নেই। গবেষণায় ১০টি দলের নেতৃত্বে পরিবারকেন্দ্রিকতার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ১২টি দলের প্রধানের অন্তত এক দশক ধরে একই পদে থাকার নজির রয়েছে। আনুষ্ঠানিক কমিটি ও কাউন্সিলের ব্যবস্থা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তির প্রভাবই বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
জবাবদিহির চিত্রেও উঠে এসেছে বেশ কিছু দুর্বলতা। ১৬টি রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় না। যেসব সভা হয়, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণেও অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
প্রার্থী বাছাইয়ে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ব্যবসায়িক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও এসেছে গবেষণায়। প্রভাবশালী তিনটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে টিআইবি। একই সঙ্গে গত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থী ও ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
আইনগত কাঠামোর দুর্বলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। গবেষণায় সাতটি দলের গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আইনে সহযোগী বা অঙ্গসংগঠন গঠনের বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও বিভিন্ন দলের ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠন পরিচালনার চর্চা অব্যাহত রয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, অর্থ লেনদেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও গবেষণায় উঠে এসেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো কোনো দল সহজে নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। দলীয় পর্যায়ে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দলগুলোর নিজস্ব পরিচালনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যকর চর্চা নিশ্চিত হয়নি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠায় ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে কালো টাকার প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোয় নারীদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তৃণমূলের মতামত ও অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত থাকায় নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ এবং পরিবারতান্ত্রিক প্রবণতা জোরালো হচ্ছে। দলগুলোর ভেতরে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা না হলে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার শুরু করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে দলগুলোকেই নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর করতে হবে।
গবেষণায় মোট ১২টি সুপারিশ দিয়েছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা ২০০৮ সংশোধন, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর আওতায় রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো।
এ ছাড়া নিবন্ধিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং প্রতিষ্ঠান দিয়ে দলগুলোর আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন, নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালট চালু এবং দলীয় প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচনী মনোনয়নে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওসার আহমেদ, কাজী আমিনুল হাসান এবং সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।




