টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের পর ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অধিকাংশ পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। তবে আশুলিয়ায় শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই এলাকায় ৭০টি কারখানায় এক দিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়।
সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় সকালে শ্রমিকেরা কাজে প্রবেশ করলেও নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর, জামগড়া, সরকার মার্কেট, জিরাবো ও কাঠগড়া এলাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন। পরে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর প্রতিবাদে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জিরাবো এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন বিভিন্ন কারখানার প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার শ্রমিক। মিছিলটি কয়েকটি এলাকা ঘুরে এনভয় গার্মেন্টসের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে জামগড়ায় কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে অন্যদেরও কাজে যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান। কয়েকটি কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এ সময় পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তাঁদের আওতাধীন ১ হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। অন্য কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে আগ্রহী হলেও বহিরাগতদের বাধা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারের অভিযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও থানা পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। আশুলিয়ায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানির অভিযোগে সাভার ও আশুলিয়ায় আটটি মামলা হয়েছে। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন জানান, এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে।
গাজীপুরেও বৃহস্পতিবার সড়ক-মহাসড়কে শ্রমিকদের কোনো অবরোধ দেখা যায়নি। সকাল থেকে শ্রমিকেরা নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরেছেন এবং অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে আগে থেকেই ছুটি ঘোষণা করা কিছু কারখানা বন্ধ ছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে বিজিবির ১২ প্লাটুন, আনসারের পাঁচ প্লাটুন এবং এসআরবির আট প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দায়িত্ব পালন করছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান বলেন, আন্দোলনের পরিস্থিতিতে পুলিশের ওপর হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তার অভিযোগ, শ্রমিকদের দাবির বাইরেও একটি পক্ষ পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে গাজীপুরে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। সভা থেকে শ্রমিকদের বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, সরকার শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। তিনি শিল্পকারখানা সচল রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন।
নারায়ণগঞ্জেও তিন দিনের বিক্ষোভের পর বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। ফতুল্লার কাঠেরপুল, রামারবাগ, শিবু মার্কেট ও নয়ামাটি এলাকার পোশাক কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেন। তবে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। নগরীর চাষাঢ়ায় জলকামান ও সাঁজোয়া যানও মোতায়েন রাখা হয়।
বাংলাদেশ ট্রাস্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এফ এম আবু সাঈদ জানান, শ্রমিকেরা কর্মস্থলে ফিরেছেন এবং পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে শ্রমিক আন্দোলনে বিভিন্ন মহলের উসকানি থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থানে সতর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে পোশাকশিল্পের অস্থিরতা নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৈঠকে কারখানার মালিকেরা চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। তাঁদের বক্তব্য, অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকার শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আড়ালে যারা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানসহ পোশাকশিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মালিকপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং শ্রমিকদের সহযোগিতা পাওয়া না গেলে ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ নীতি অনুসরণের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।




