দেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল থেকে বের হওয়া  বিষাক্ত সিসা (লেড) মিশে যাচ্ছে রান্না করা খাবারে। নতুন হাঁড়ির উপরিভাগে সহজে নির্গত হওয়ার মতো সিসা বেশি থাকে। ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিমাণ কমতে থাকলেও  ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। এমন হাঁড়িতে রান্না করা খাবারে সিসার মাত্রা শিশুদের খাবারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) নির্ধারিত সীমা  (প্রতি কেজি খাবারে ১০ মাইক্রোগ্রাম) অতিক্রম করেছে। বিষাক্ত সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। সিসার বিষক্রিয়া শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।

সম্প্রতি এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকরা জানান, দৈনন্দিন রান্নার মধ্য দিয়ে সিসার সংস্পর্শে আসার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এ ঝুঁকি কমাতে উৎপাদনমান উন্নত করা, এমন পাত্রের ব্যবহারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতামূলক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণায় দেশে প্রচলিত হাতে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে কতটা সিসা মিশছে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, নতুন হাঁড়ি-পাতিলে সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেশি। হাঁড়ি ঘষে পরিষ্কার করলেও খাবারে সিসা মেশার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বিশেষ করে পুরোনো ধাতু বা ভাঙারি গলিয়ে তৈরি এসব তৈজসপত্র শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে শিশুরা সাধারণত যে পরিমাণ ভাত খায়, সে বিবেচনায় এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত রেফারেন্স মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে।
 
দেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরোনো কাপড়ের সঙ্গে বাসন-কোসন বিনিময় করার প্রচলন রয়েছে। গবেষণায় এই বিষয়ে সরাসরি  কাজ করা না হলেও গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই রান্নার পাত্রকে নিরাপদ ভাবার সুযোগ নেই।

সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতু ঠিকভাবে পরীক্ষা না করলে তৈরি পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে।

অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে কতটা সিসা মিশছে, তা পরীক্ষায় দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমে তরল খাবারের প্রভাব বোঝার জন্য ৪ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিড ব্যবহার করে সিসা নির্গমনের পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি এসব পাত্রে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে তাতে সিসার পরিমাণ পরিমাপ করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, খাবারের অম্লতা, হাঁড়ির ব্যবহারের ইতিহাস এবং নাড়াচাড়া বা ঘষাঘষির ওপর সিসা নির্গমনের পরিমাণ নির্ভর করে। প্রথমবার ঘষে পরিষ্কার করে ব্যবহার করলে ঘষা ছাড়া ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা নির্গত হয়। দ্বিতীয়বার  ঘষে পরিষ্কার করে ব্যবহার করলে প্রায় তিন গুণ বেশি সিসা পাওয়া যায়।

নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্না খাবারে সিসার পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি,  রান্না করা ভাতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়। অ্যালুমিনিয়ামের এসব পাত্র সিসার সংস্পর্শে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উপেক্ষিত উৎস বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।