২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই মুদ্রণের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহ করতে পারবে না ২৬টি ছাপাখানা—এমন আশঙ্কাও উঠে এসেছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, দরপত্রের প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ, দরপত্র জমা এবং কাজ ভাগাভাগি নিয়ে একটি সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী একটি ছাপাখানা-সংশ্লিষ্ট পরিবারের একাধিক প্রতিষ্ঠান বেশি কাজ পেয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহের নির্দেশ
গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কয়েকটি ছাপাখানার মালিককে ডেকে পাঠান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।বৈঠকে মন্ত্রী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মানসম্মত সব পাঠ্যবই সরবরাহের নির্দেশ দেন। যারা নির্ধারিত সময়ে বই দিতে পারবে না, তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে প্রয়োজনে চীন থেকে বই ছাপিয়ে আনার প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি।বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার-উজ-জামান রুবেল বৈঠকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বই সরবরাহের সম্ভাবনার কথা জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি বইয়ের জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে শতভাগ বই সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে মন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন।এ ছাড়া নিম্নমানের বই ছাপার অভিযোগের বিষয়েও একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয় বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ধেক বই ছাপানোর লক্ষ্য থাকলেও বুধবার পর্যন্ত ছাপার কাজ ৩০ শতাংশের নিচে ছিল। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এবং শেষ সময়ে মান যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা বই সরবরাহে বিলম্বের অন্যতম কারণ হতে পারে।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মোট ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতে একটি করে দরপত্র জমা পড়ে। ১৩টিতে দুটি করে এবং বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়েছিল।অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র চলমান অবস্থায় প্রাক্কলিত মূল্য পরিবর্তন এবং ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০২৫ অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।দরপত্রসংক্রান্ত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রতিবেদনে ‘স্কাই রি-অ্যারেঞ্জ লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সিআইডির মামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না; এ বিষয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফল গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে, বই মুদ্রণ খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দেশীয় ছাপাখানাগুলোর মধ্যে অনিয়ম ও প্রতিযোগিতার অভাব অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই খাত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।সব মিলিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, মুদ্রণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো বই সরবরাহ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।