বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৯তম বারের মতো পিছিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ২৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ছিল। তবে সিআইডি প্রতিবেদন দাখিল না করায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রুকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যেভাবে চুরি হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার
২০১৬ সালের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশের হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠায়। আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহৃত সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পাঠানো এসব নির্দেশের সাহায্যে প্রায় ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সব লেনদেন কার্যকর হয়নি।
মোট ৩৫টি নির্দেশের মধ্যে কয়েকটি আটকে যায়। শ্রীলঙ্কার একটি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঠানো ২ কোটি ডলারের নির্দেশে ‘foundation’ শব্দটি ভুল করে ‘fundation’ লেখা হয়েছিল। বানানগত এই ভুলের কারণে লেনদেনটি সন্দেহজনক হয়ে ওঠে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর যোগাযোগে তা ঠেকানো সম্ভব হয়।
অন্যদিকে, ফিলিপাইনের চারটি হিসাবে পাঠানো মোট ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের নির্দেশ কার্যকর হয়। অর্থ চলে যায় রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) ম্যানিলার একটি শাখার চারটি হিসাবে। পরে ক্যাসিনো ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থের বড় অংশ ছড়িয়ে পড়ে।
ক্যাসিনো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অর্থ
চুরির অর্থ ফিলিপাইনে পৌঁছানোর পর বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্ট চ্যানেলে স্থানান্তর করা হয় বলে দেশটির তদন্ত ও সিনেটের শুনানিতে উঠে আসে। ২০১৬ সালের মার্চে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, চুরি হওয়া অর্থের প্রায় ৩ কোটি ডলার নগদে ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্ট এক অপারেটরের কাছে পৌঁছেছিল। অর্থের উৎস আড়াল করতে একাধিক ধাপে লেনদেন করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীরা ধারণা করেন।
চুরির পর কিছু অর্থ উদ্ধার বা জব্দ করা সম্ভব হলেও পুরো অর্থ ফেরত পাওয়া যায়নি। অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা, দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নির্ধারণ এবং বাকি অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
মামলা সিআইডিতে, আটকে আছে তদন্ত
২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন। পরদিন ১৬ মার্চ মামলার তদন্তভার সিআইডিকে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা না পড়ায় মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগোয়নি। অর্থ সরানোর পেছনে কারা ছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যবস্থার কোন দুর্বলতা কাজে লাগানো হয়েছিল এবং দেশের ভেতরে কারও সহায়তা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের কথা।
তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৯ বার পিছিয়ে যাওয়ায় মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আগামী ২৫ নভেম্বর সিআইডি প্রতিবেদন জমা দিতে পারে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।




