আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির পথে একাধিক বাধা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব, বিমান পরিবহনের বাড়তি খরচ, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ে উদ্বেগ এবং বিমানবন্দরে হিমাগারের ঘাটতি—সব মিলিয়ে চাপে পড়েছেন রপ্তানিকারকেরা। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তাজা সবজি রপ্তানি থেকে আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কমেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সবজি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ২ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার।
রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে আয় আরও কমতে পারে। তাদের অন্যতম প্রধান বাজার সৌদি আরবের সঙ্গে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় পচনশীল সবজি পাঠানো কঠিন হয়ে উঠছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরুতে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ১৩৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশ ফল, সবজি ও এলাইড পণ্য রপ্তানিকারক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী আনোয়ার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প বাজারে সবজি পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। এর সঙ্গে বিমান ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ও কার্টনের দাম বৃদ্ধি রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেনেটার তথ্য অনুযায়ী, ২১-২৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে বিমান কার্গো পরিবহনের স্পট রেট ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের তুলনায় ৯১ শতাংশ বেশি ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ১ অক্টোবরের বাজার হালনাগাদে আরও বলা হয়, সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক বিমান কার্গোর গড় স্পট রেট ছিল প্রতি কেজি ৩ দশমিক ১০ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে এ হার বেড়েছে ২৭ শতাংশ।
গ্লোবাল ট্রেড লিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ রুবেল জানান, তার হিসাবে প্রতি কেজি সবজি পরিবহনে বিমান ভাড়া গত বছরের ৪৯০-৫০০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৫০ টাকার বেশি হয়েছে। ইউরোপে কিছু বাংলাদেশি সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরীক্ষার কড়াকড়িও বেড়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আসা নির্দিষ্ট ধরনের বিনের ৩০ শতাংশ চালান এবং জারা লেবুর ২০ শতাংশ চালানে পরিচয় যাচাই ও শারীরিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রুবেলের অভিযোগ, বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় নিরাপত্তা তল্লাশির পর পচনশীল পণ্য তিন থেকে চার ঘণ্টা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পড়ে থাকে। এতে পণ্যের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিকে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মোবাশ্শেরুর রহমানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কানাডায় সবজি পাঠানোর বিমান ভাড়া প্রতি কেজিতে গত বছরের ৩০০-৩৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫০-৮০০ টাকা হয়েছে। লন্ডনের ক্ষেত্রে তা ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৫০ টাকার বেশি হয়েছে। এসব ভাড়ার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে দেড় কোটি টনের বেশি সবজি উৎপাদিত হলেও মোট উৎপাদনের ০.৩ শতাংশেরও কম বিদেশে রপ্তানি হয়। রপ্তানিকারকদের মতে, পরিবহন ব্যয় কমানো, মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং পচনশীল পণ্য সংরক্ষণের সুবিধা বাড়ানো না গেলে এ খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়বে।