কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে নতুন করে তালিকা তৈরির কাজ করছে পুলিশ। তালিকা চূড়ান্ত হলে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমন্বিত অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ ছাড়া সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও অন্যান্য অপরাধের ঘটনায় উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব ইউনিটকে সক্রিয় গ্যাং, তাদের সদস্য, সংগঠক ও অর্থদাতাদের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান গত ১৭ অক্টোবর জানান, তালিকা তৈরির নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছে। তথ্য হাতে পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযানের কর্মপরিকল্পনা করা হবে। অপরাধের রেকর্ড নেই, এমন ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হবে না বলেও জানান তিনি।
পুলিশের বিশেষায়িত একটি ইউনিটের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩৩৩টি গ্যাং, ২১৩ জন দলনেতা বা সংগঠক এবং ২৭ জন পৃষ্ঠপোষকের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করেছে। পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানোর আগে তালিকাটি বিভাগীয় পর্যায়ে যাচাই করা হচ্ছে। তবে এসব তথ্যের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে কেবল গ্যাংয়ের সদস্য সন্দেহে আটক করে দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া কঠিন। অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানের ভাষ্য, অপরাধ দমনে কঠোর হতে হবে, তবে আইন ও মানবাধিকারের সীমা অতিক্রম করা যাবে না। গ্যাংয়ের পেছনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩০৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৯৩টি, ঢাকা রেঞ্জে ৭৮টি এবং চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি গ্যাংয়ের উল্লেখ রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকায় রয়েছে ৪১টি গ্যাং। তবে কয়েকটি মহানগর ও রেঞ্জে এ ধরনের গ্যাংয়ের কোনো তালিকা নেই। ফলে পুরোনো ও অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণেও জটিলতা রয়েছে।
পুলিশের তথ্যভান্ডার বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৪৮টি গ্যাংয়ের ২৭০ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৯টি ফৌজদারি মামলা হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের তালিকাভুক্ত সদস্য ৫৭৭ জন। অন্যদিকে, এসআরবির এক কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে সন্দেহভাজন গ্যাংয়ের ১৭৪ সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের তৎপরতা বাড়ে কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর। গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে জেলার ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা শাখা সমন্বিত অভিযান শুরু করে। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ৮১১ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। তাদের অনেককে পরিবারের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এই অভিযান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িতদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের বিষয়টি সামনে এনেছে।
এদিকে, গত ১৫ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মুখোশধারীদের হামলায় এক তরুণ ছুরিকাহত এবং তার বাবা গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের ধারণা, ‘পাটালি’ ও ‘সাজ্জাদ’ নামে দুটি অপরাধী চক্রের বিরোধ থেকে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় সক্রিয় কিছু চক্রের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. উমর ফারুক মনে করেন, শুধু কিশোরদের আটক করে গ্যাং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার মতে, অপরাধে কিশোরদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক ও পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের নিয়মিত নজরদারি, কাউন্সেলিং ও যথাযথ পরিচর্যার ব্যবস্থা করা জরুরি। এ সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।