অনলাইন টিকিট বিক্রি শুরুর আগেই ‘বট’ ব্যবহার করে টিকিট আটকে রেখে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে রেলের টিকিট বিক্রির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেইউর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় তদন্ত শুরু করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থার নিরীক্ষায় নিরাপত্তার বিভিন্ন দুর্বলতা ধরা পড়েছে। নিরীক্ষায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সহজের দেওয়া ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করছে রেলওয়ে।
গত ১১ অক্টোবরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে সহজের যৌথ উদ্যোগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত জবাব চাওয়ার সুপারিশ করা হয়। এতে অভিযোগ করা হয়, ‘বুকমাইরেলবিডিডটকম’ নামের অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বট ব্যবহার করে টিকিট আটকে রাখা হতো, যাতে পরে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করা যায়।
২০ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষায় এমন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে যে অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট বিক্রি শুরুর কয়েক দিন আগেই টিকিট আটকে রাখা সম্ভব ছিল। সহজের কর্মীদের পরিচালিত অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিনিধি এবং রেলের বুকিং সহকারী বা টিকিট মাস্টারদের যোগসাজশে কালোবাজারি হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অডিট রিপোর্টে সহজের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। অন্য পর্যবেক্ষণগুলো রেলের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সহজের জবাব পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কালোবাজারিতে প্রতিষ্ঠানটির সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
মহাপরিচালক বলেন, কোচ সংযোজন বা বাদ দেওয়া এবং আসনের তথ্য হালনাগাদের জন্য কিছু স্টেশনে সহজের অ্যাডমিনদের বিশেষ সুবিধা ছিল। কিছু অ্যাকাউন্ট স্টেশন মাস্টারদের নামেও নিবন্ধিত ছিল। এসব কাজ এখন রেলের পরিচালন ও বাণিজ্যিক বিভাগের অধীনে নেওয়া হচ্ছে।
সহজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবহন নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের জবাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষায় ওঠা বিষয়গুলো চুক্তির শর্ত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষয়গুলো পর্যালোচনায় থাকায় এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চায় না প্রতিষ্ঠানটি। তবে নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা এবং যাত্রীসেবা, তথ্যনিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
কালোবাজারি ঠেকাতে প্রায় ১০ হাজার সন্দেহভাজন মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ব্লক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক। অননুমোদিত ওয়েবসাইটটি বন্ধ করতে বিটিআরসিকেও অনুরোধ জানানো হয়েছে।
২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষায় অনলাইন টিকিট বিক্রির রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি এবং সহজের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় না করার বিষয়ও উঠে এসেছে। এর আগে ধীরগতির সার্ভার, সিস্টেম বিকল হওয়া ও অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক ও জরিমানা করা হয়েছিল বলে জানান আফজাল হোসেন। জরিমানার অর্থ সরাসরি আদায় না করে পাওনা বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হতো।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সহজের পাঁচ বছরের চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হবে। এর আগেই নতুন টিকিটিং এজেন্সি নিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছে রেলওয়ে। মহাপরিচালক জানান, দরপত্রের কাগজপত্র প্রস্তুত এবং আগামী সপ্তাহে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন এজেন্সি নিয়োগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তিনি স্পষ্ট করেননি।