রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে দলীয় অঙ্গন ও রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ঢাকার দুই সিটির ভোটের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। ফলে ভোট কবে হবে, সে প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর না মিললেও মেয়র পদ ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে এনসিপির প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। জামায়াতে ইসলামী উত্তরে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিএনপির ক্ষেত্রে উত্তরে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ও সাবেক মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের নাম আলোচনায় রয়েছে। দক্ষিণে প্রশাসক আবদুস সালাম, সদ্য সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সিটির মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেনি।
নির্বাচন কবে, কী বলছে কমিশন
ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মূল কারণ হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সামগ্রিক সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত না হওয়া। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এসএসসি পরীক্ষা, রমজান, ধর্মীয় উৎসব ও জাতীয় কর্মসূচির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন তিনি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এর আগে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছিলেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঘোষণা করা সম্ভব হতে পারে বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কমিশনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন একই সময়ে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেই। কোন নির্বাচন আগে হবে, তা পরিস্থিতি ও আইনগত বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নির্ধারণ করা হবে।
গত ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পাঁচ ধাপের সময়সূচি চূড়ান্ত করে। প্রথম ধাপের ভোট আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপে ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপে ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপে ২৭ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ এখনো জানানো হয়নি।
এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটির ভোট আগামী বছরের প্রথমার্ধে হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। কমিশনের আনুষ্ঠানিক তফসিলই এ বিষয়ে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেবে।
উত্তরে এনসিপির আসিফ, জামায়াতের সেলিম
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার নাম ঘোষণা করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসা আসিফ মাহমুদের প্রার্থিতার মধ্য দিয়ে উত্তর সিটিতে নতুন রাজনৈতিক শক্তির নির্বাচনী পরীক্ষা সামনে এসেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৪ সেপ্টেম্বর দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দুই সিটির প্রার্থীদের নাম জানান। জামায়াতের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর কাজ চলছে।
উত্তরে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ও তাবিথ আউয়াল। শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। পরে তাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক করা হয়। অন্যদিকে তাবিথ আউয়াল এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। পরিচিত রাজনৈতিক মুখ ও নগর রাজনীতিতে আগের অভিজ্ঞতার কারণে তার নামও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এসব নামের মধ্যে কাকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে, তা বিএনপির নীতিনির্ধারকেরাই চূড়ান্ত করবেন। প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই মেয়র প্রার্থী হবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন-সাদিক, বিএনপিতে একাধিক নাম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এনসিপি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তার নাম জানান। দক্ষিণ সিটির রাজনীতিতে নাসীরুদ্দীনের প্রার্থিতা এনসিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দলটি রাজধানীর দুই অংশেই নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেদের অবস্থান যাচাই করতে চাইছে।
জামায়াতে ইসলামী দক্ষিণে সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিতি পাওয়া সাদিক কায়েমের প্রার্থিতা দলটির তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে নির্বাচনে তার গ্রহণযোগ্যতা কতটা বিস্তৃত হয়, তা নির্ভর করবে নগরবাসীর সমর্থন, প্রচার ও নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর।
দক্ষিণে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম ও সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। এ ছাড়া হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে। ইশরাক হোসেন নগর রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। কিন্তু সম্প্রতি অস্ত্রকাণ্ডে সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছেন। তাই তার বিষয়ে বিএনপি কি সিদ্ধান্ত নেয়, তা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে আবদুস সালামের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় আসতে পারে। কিন্তু বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কাউকেই চূড়ান্ত প্রার্থী বলা যাচ্ছে না। একাধিক সম্ভাব্য নাম আলোচনায় থাকায় শেষ পর্যন্ত দলটি কাকে বেছে নেয়, সেটিও নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কাউন্সিলর পদেও প্রস্তুতি
মেয়র পদের পাশাপাশি দুই সিটির কাউন্সিলর পদেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে। ২০ অক্টোবর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মোট ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১২টিতে জামায়াতে ইসলামী সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের নাম অভ্যন্তরীণভাবে ঠিক করেছে। এর মধ্যে উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ডের ৪৩টিতে এবং দক্ষিণের ৭৫টি ওয়ার্ডের ৬৯টিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তাদেরও চূড়ান্ত মনোনয়ন এখনো সম্পন্ন হয়নি।
স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ওয়ার্ডভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন। বিএনপি ও এনসিপির ক্ষেত্রেও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি নির্বাচনী হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এবারের নির্বাচন নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার ও প্রার্থী সমর্থনের ধরন। নির্বাচন নির্দলীয় পদ্ধতিতে হলে ব্যালটে দলীয় প্রতীক থাকবে না। সে ক্ষেত্রে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, দলীয় সমর্থন, স্থানীয় সংগঠন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্ব পাবে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কতটা নগর ভোটে রূপান্তরিত হয়, তা-ও দেখা যাবে।
ভোটের লড়াইয়ে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ
ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দলীয় জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হবে না; নগরবাসীর দৈনন্দিন সমস্যাও নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে থাকার কথা। যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও ফুটপাতের অবস্থা, মশা নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ চলাচল এবং নাগরিক সেবার মান—এসব বিষয়ে প্রার্থীদের অবস্থান ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে দুই সিটির প্রশাসনিক বাস্তবতা ও ওয়ার্ডভিত্তিক সমস্যার ভিন্নতা প্রার্থীদের সামনে আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, নগর পরিচালনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রতিশ্রুতিও গুরুত্ব পাবে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিএনপি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে চাইবে। জামায়াত নিজেদের সাংগঠনিক বিস্তার ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতির ওপর ভরসা করতে পারে। আর এনসিপি জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ভোটে রূপান্তরের চেষ্টা করবে। তবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা হলেই নির্বাচনী ফলের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। ভোটারদের মনোভাব, নির্বাচনের পরিবেশ, প্রার্থীদের প্রচার এবং কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা—সব মিলিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃতি নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রস্তুতি এগোলেও ভোটের দিন এখনো অনির্ধারিত। এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে; বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা চলছে। এখন নজর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং বিএনপির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে। সেই দুই সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে, রাজধানীর দুই মেয়র পদে চূড়ান্ত লড়াইয়ে কারা থাকছেন এবং ভোটের মাঠ কতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।