রান্নার গ্যাস এলপিজির দাম নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে এবার পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার গণশুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এলপিজির মূল্য নির্ধারণে তার প্রভাব পড়তে পারে।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসছে বিইআরসি। তবে এই প্রথম কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। চলতি মাসের ১৩ অক্টোবর ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের চার পরিবেশক কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেন।
আবেদনকারীদের প্রস্তাব অনুযায়ী, পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি খরচ গ্রাহকের
বিইআরসি নির্ধারিত দাম ও বাজারের বাস্তব চিত্রের মধ্যে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। তবে সরবরাহ সংকটের কথা বলে অনেক জায়গায় গ্রাহকদের সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত।
পরে ৪ অক্টোবর সিলিন্ডারপ্রতি ২৫২ টাকা বাড়িয়ে দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। কিন্তু বাজারে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ২ হাজার ২০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি। কোনো কোনো গ্রাহককে একটি সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যকাঠামো অনুযায়ী, আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকদের কাছে ১ হাজার ৭৪২ টাকায় বিক্রি করবে। পরিবেশকের বিতরণ খরচ ৫০ টাকা যোগ হলে খুচরা বিক্রেতার কাছে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৯২ টাকা। এরপর খুচরা বিক্রেতার ৪৫ টাকা কমিশন যোগ করে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
তবে বাজারে এই কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কয়েকজন। তাদের ভাষ্য, কিছু পরিবেশক কোম্পানির কাছ থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। এরপর পরিবহন ও অন্যান্য খরচের কথা বলে বাড়তি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়েও যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফা।
কমিশন বাড়ানোর পক্ষে পরিবেশকদের যুক্তি
পরিবেশকদের দাবি, বিইআরসি নির্ধারিত কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, কিছু কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যে পরিবেশকদের গুদামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেয় না। ফলে নিজস্ব পরিবহনে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার এক পরিবেশক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, কিছু কোম্পানি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও পরিবহনসহ গুদামে পৌঁছাতে সিলিন্ডারপ্রতি আরও ৪০ থেকে ৫০ টাকা খরচ হয়। অনেক সময় সিলিন্ডারের জন্য দুই থেকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়। লোডিং-আনলোডিং, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য ব্যয়ও রয়েছে।
ওই পরিবেশকের দাবি, কিছু কোম্পানি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার সরবরাহ করলেও অন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত কমিশনের মধ্যে থেকে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, মগবাজার এলাকার এক খুচরা বিক্রেতা অভিযোগ করেন, পরিবেশকেরা কয়েক মাস ধরে রসিদ দেওয়া বন্ধ রেখেছেন। রসিদ চাইলে সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি তাঁর। পরিবেশকদের কাছ থেকেই ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হলে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আমদানিকারকদেরও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব
শুধু পরিবেশক বা খুচরা বিক্রেতারাই নন, এলপিজি আমদানিকারকেরাও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। চলতি মূলধন, ঋণের ব্যয় এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রতি কেজি এলপিজির সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ খরচ ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুসরণ করতে চান। কিন্তু বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় অনেক সময় সেই দাম বজায় রাখা সম্ভব হয় না।
বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
এলপিজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, কয়েকটি কোম্পানি সিলিন্ডার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে বলে তাঁর অভিযোগ। এতে গ্রাহকেরা বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বাজারে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে বিচারিক তদন্ত এবং দোষী সাব্যস্ত কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, কোম্পানিগুলোর মূল্য নির্ধারণ এবং খুচরা বাজারে বিইআরসির নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়ও গণশুনানিতে গুরুত্ব পেতে পারে।
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হলে মূল্যকাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে বিইআরসির সিদ্ধান্ত এবং সংশোধিত মূল্য নির্ধারণের ওপর।