মেঘনা নদীর বুকে একের পর এক নতুন ভূমি জেগে ওঠায় বদলে যাচ্ছে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ভূপ্রকৃতি। নদীভাঙনে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি হারানোর বিপরীতে এসব নতুন চর সৃষ্টি করছে বসবাস, কৃষি উৎপাদন এবং পর্যটন বিকাশের সুযোগ। তবে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হলে সম্ভাবনাময় এসব ভূমি দখল ও বিরোধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গত চার দশকে হাতিয়ার চারপাশে ছোট-বড় তিন শতাধিক চর জেগে উঠেছে। এসবের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নথিভুক্ত হয়েছে। কোনো কোনো চরে ইতোমধ্যে জনবসতি গড়ে উঠেছে। কোথাও চলছে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ, আবার বিস্তীর্ণ এলাকায় গবাদিপশুর চারণভূমি তৈরি হয়েছে।
চর আতাউরে ২০২০ সালে নৌবাহিনীর উদ্যোগে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০ ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এর বাইরে আরও শতাধিক পরিবার সেখানে বসবাস করছে। চরটির অনেক জমি এখনো অনাবাদি থাকলেও স্থানীয়রা সেগুলো কৃষিকাজ ও পশু পালনে ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে, সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চর এখনো জনবসতিহীন। সেখানে জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত বছর সংঘর্ষে প্রায় আটজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নব্বইয়ের দশকে জেগে ওঠা ঢালচরে বর্তমানে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস।
একসময় জলদস্যুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত জাহাইজ্জার চর বর্তমানে স্বর্ণদ্বীপ নামে পরিচিত। ২০১৩ সালে এর নাম পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। প্রায় ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটিতে প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ৬০ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। বর্তমানে এটি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এদিকে, প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভাসানচরে ‘আশ্রয়ণ-৩’ প্রকল্পের আওতায় মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের নিরাপত্তায় নির্মাণ করা হয়েছে উঁচু বেড়িবাঁধ ও আবাসন সুবিধা।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান জানান, বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছর প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন টন পলি জমা হয়। এই পলি থেকেই নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে। এসব জমিতে বাদাম, সয়াবিন ও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ভালো ফলন সম্ভব। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা থাকলে কৃষির পাশাপাশি পর্যটন খাতেও চরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নোয়াখালীর উপপরিচালক আশীষ কুমার কর বলেন, নদীভাঙনে বসতভিটা হারানো মানুষ অনেক সময় কৃষিজমিতে ঘর নির্মাণে বাধ্য হন। এতে আবাদি জমি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বসবাসের উপযোগী নতুন চরগুলোতে ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করা গেলে কৃষিজমির ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, নতুন চরগুলো দখলমুক্ত রাখা এবং পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশাসন কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি চরের জমি ভূমিহীনদের বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এসব নতুন ভূমি দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।