সারা দেশে গ্যাসের সংকটে দিশেহারা মানুষ। ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এতে শিল্পে উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকা ছাড়াও সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিংসহ অর্থনীতিতে নানামুখী বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কবে টার্মিনালটি সচল হবে, তা নিয়ে যখন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, তখনই গ্যাস সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, ১০-১৫ আগস্ট দুটি এলএনজিবাহী কার্গো সরবরাহে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি রাজি না হওয়ায় এ সংকট সামনে এসেছে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে টেন্ডারও আহ্বান করা হয়েছিল। টেন্ডারে কোনো কোম্পানি এলএনজিবাহী কার্গো সরবরাহে রাজি হয়নি। ফলে গ্যাস নিয়ে চলমান সংকট আরও তীব্র হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এ সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি আংশিক চালু করা সম্ভব হলেও এলএনজিবাহী কার্গোর অভাবে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে মারাত্মকভাবে। সূত্র বলছে, টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার পর এলএনজি আমদানি সূচিতে বিপর্যয় ঘটে। যার কারণে বন্ধ টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত কোনো সরবরাহকারী এলএনজি দিতে চাচ্ছে না।সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে চালু আছে সামিট গ্রুপের এফএসআরইউ বা টার্মিনাল।
সেই চালু টার্মিনাল দিয়ে জাতীয় গ্রিডে ১০ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দুটি এলএনজিবাহী কার্গো (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহে এখনো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রাজি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আজ-কালের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ করতে সৌদি কোম্পানি আরামকো এবং মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির কাছে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা।
১০ থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে নিয়মিত এলএনজি কার্গো পাওয়া না গেলে দেশে গ্যাসের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার সব উদ্যোগ নিচ্ছে। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তা বন্ধ রয়েছে। এটি চালুর জন্য এ পর্যন্ত তিন-চরবার তারিখ ঘোষণা করা হলেও তা চালু হয়নি। এখন বলা হচ্ছে, ৫ আগস্টের দিকে আংশিক চালু হলেও হতে পারে, তবে তা নিশ্চিত নয়। এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে সারা দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নামায় সারা দেশে লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির সূচিতে বিপর্যয় ঘটেছে। টার্মিনালটি চালু না হওয়া পর্যন্ত কোনো সরবরাহকারী এলএনজি দিতে চাইছে না। জানা যায়, ১০ থেকে ১৫ আগস্ট এবং ১৫ থেকে ১৬ আগস্ট স্পট মার্কেট থেকে ৩টি এলএনজি কার্গো সরবরাহ দিতে গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক দরপত্র ডেকেছিল আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড)। সেই দরপত্রে ১০ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দুটি কার্গো এলএনজি সরবরাহে তালিকাভুক্ত ১৬-১৭টি কোম্পানির কেউই সম্মত হয়নি। তবে ১৫-১৬ আগস্ট একটি কার্গো সরবরাহে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ভিটল এশিয়া লিমিটেড, সিঙ্গাপুর।
প্রতি ইউনিট এলএনজি তারা ২২ দশমিক ৩৫ ডলারে সরবরাহ করবে। এই দরে এক কার্গো এলএনজির দাম পড়বে ৯৪৯ কোটি ৪৩ লাখ ১২ হাজার ১৮৪ টাকা। কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে ১০ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ নিয়ে। ওই দুই কার্গো সামিটের টার্মিনালের জন্যই দরপত্র ডাকা হয়েছিল। বর্তমানে সামিটের টার্মিনাল হয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৫০ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন এলএনজিবাহী যে কার্গোটি আছে, সেটি মঙ্গলবার পর্যন্ত চলবে। এরপর ৫ আগস্ট আরও একটি কার্গো সামিটের টার্মিনালে এসে ভিড়বে। সেটি কয়েকদিন চলবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও এক্সিলারেট, কাতার এনার্জি, আরামকো, ওমান গ্যাসসহ কয়েকটি কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য-যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রসেসিং প্ল্যান্ট এবং ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই গ্যাস সরবরাহ তারা স্থগিত করেছে। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এখন এই কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের বিপদে ১০ থেকে ১৫ আগস্টের জন্য ২-৩টি কার্গো বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দিতে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তবে কেউ সাড়া দিয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বঙ্গোপসাগরের বহির্নোঙরে টোটাল কোম্পানির একটি এলএনজিবাহী জাহাজ প্রায় ৬ দিন অপেক্ষা করছে। এটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য আনা হয়েছিল। যে কোনো মুহূর্তে ওই টার্মিনাল চালু হলে ওই কার্গো থেকে এলএনজি খালাস করা হবে। এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য গানবোর এশিয়ার একটি কার্গো রেডি রাখা হয়েছে। সেটি ৯ থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে দেশে আসার কথা। কিন্তু টার্মিনালটি কবে চালু হবে এবং ওই এলএনজি কবে খালাস করা হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, এক্সিলারেট এখনো সুনিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
ঢাকায় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে : ওপরের নির্দেশনার পর ঢাকা এবং এর আশপাশে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। এসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহকারী তিতাস গ্যাস সিস্টেম কোম্পানিকে এজন্য রোববার রাত ১২টার পর দৈনিক ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আর এজন্য বাখরাবাদ, কর্ণফুলী এবং জালালাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকরা আরও কম গ্যাস পাচ্ছেন। জানা যায়, রোববার সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২১৪ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে তিতাস পেয়েছে ১২১ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলী ২১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদ ২১ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদ ২৯ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চল ৯ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন বিতরণ কোম্পানি ৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। বাকি কয়েক কোটি ঘনফুট গ্রিডের বাইরে ব্যবহার করা হয়েছে।
লোডশেডিং ভয়াবহ : গ্যাস সংকটের কারণে সারা দেশে লোডশেডিং ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকাল ৩টায় সারা দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৩৪ মেগাওয়াট। এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট। বিকাল ৫টায় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৬৩ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ন্যূনতম চাহিদা ১০০ কোটি ঘনফুট। সেখানে এখন সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাস দিয়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও করা হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। পায়রার ৬০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ। যে কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন কমেছে।
সারা দেশে গ্যাস সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে
সারা দেশে গ্যাসের সংকটে দিশেহারা মানুষ। ২১ জুলাই এলএনজি টার্মিনাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। এতে শিল্পে উৎপাদন তলানিতে গিয়ে ঠেকা ছাড়াও সারা দেশে ভয়াবহ লোডশেডিংসহ অর্থনীতিতে নানামুখী বিরূপ
প্রিয় বাংলাদেশসারা দেশ


