জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ১৪৭ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। এ ছাড়া কর্মস্থল থেকে পলায়নের অভিযোগে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ৬২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩১ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পঞ্চম বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদসহ সদস্যরা অংশ নেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় কর্মস্থলে অনুপস্থিত বা পলাতক থাকার অভিযোগে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও তার ওপরের পদমর্যাদার ৫৭ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছে। এসব মামলায় ২৮ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং একজনকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা, আদালতে দায়ের করা অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গ্রেপ্তার ২৯ পুলিশ কর্মকর্তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি পদমর্যাদার দুজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২-এর ২০২৫ সালের চারটি মামলার রায়ের ভিত্তিতে এএসপি ও তার ওপরের পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দণ্ডিত পাঁচজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাকি আটজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
গণঅভ্যুত্থানকালে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ পুলিশ পরিদর্শককে বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। আরও ৩০ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার ৭৩ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বৈঠকে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন থানায় পদায়ন, গুম কমিশনের প্রতিবেদনে নাম আসা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধারের বিষয়েও আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য শিরীন সুলতানা নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশের থানায় বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়নের অভিযোগ তদন্তের পরামর্শ দেন। সদস্য মনোয়ার হোসেন গুম কমিশনের প্রতিবেদনে নাম আসা এবং বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন।
পুলিশের মনোবল ফেরাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও বাজেটে পৃথক বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চান সদস্য আব্দুল বাতেন। জবাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, পুলিশ সদস্যদের মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মবের কারণে দায়িত্ব পালনে পুলিশকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। থানায় পুলিশ সদস্যদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বৈঠকে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ের অপরাধের তুলনামূলক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করা হয়। ডাকাতি, দস্যুতা, খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, চুরি, মাদক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য তুলে ধরা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির চিত্রে সন্তোষ প্রকাশ করলেও মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন সদস্যরা। অপরাধ দমনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।