দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
উপদেষ্টা বলেন, বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্বাধীন গবেষণা সংস্থার মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তিতুমীরের ভাষ্য, অতীতে প্রকৃত সহায়তাপ্রার্থীদের অনেকে তালিকার বাইরে ছিলেন, আবার অযোগ্য ব্যক্তিরাও সুবিধা পেয়েছেন। নতুন ব্যবস্থায় এ ধরনের ত্রুটি কমিয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সারের আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়তে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সীমিত রাখতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। কৃষকদের স্বার্থে ডিজেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি রাজস্ব ও আর্থিক খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিতুমীর। তার দাবি, গত অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে তা বেড়ে ১২ থেকে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি বলে মনে করেন উপদেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরা গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ তুলতে পারছেন। পাশাপাশি নতুন করে আমানত জমা রাখার ঘটনাকে আস্থা ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি ও রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র ও রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এ জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং আর্থিক খাতে সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল অর্থনৈতিক সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন ও দারিদ্র্য হ্রাস নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানোর সুফল নির্ভর করবে কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়ন, উপকারভোগী নির্বাচন ও সহায়তার কার্যকারিতার ওপর।




