শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার সাফল্য নির্ধারণ না করে শিক্ষার্থীরা বছরজুড়ে কতটা শিখছে, তা মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শিক্ষার বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার, ঝরে পড়ার কারণ অনুসন্ধান এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব সুপারিশ উঠে আসে।
কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা যাচাইয়ে বছরভিত্তিক মূল্যায়নের পাশাপাশি তিন বা ছয় মাস অন্তর শিখনফল যাচাইয়ের পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতেও এ বিষয়ে সুপারিশ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
কমিটির আলোচনায় বলা হয়, শুধু পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি নয়। গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। পাশাপাশি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে যেন শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তিত না হয়, সে জন্য মালয়েশিয়ার আদলে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব এসেছে। কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়াও গণিত ও বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক মানদণ্ড চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
কার্যবিবরণীতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীকে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগের কথা বৈঠকে জানানো হয়। পাশাপাশি ৭০ লাখ ছাত্রীকে চার হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর উদ্যোগের কথা জানানো হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেককে গড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের সংকট মোকাবিলায় দুই হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছে কমিটি।
কারিগরি শিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
এ ছাড়া মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থা চিহ্নিত করা, শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করা প্রবীণ শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের সরেজমিন পরিদর্শন এবং হজযাত্রী ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া পরিশোধেও গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য শিক্ষার মান, জবাবদিহি ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানো। তবে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আসে, তা নির্ভর করবে পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর উদ্যোগের ওপর।




