অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস হিমবাহ বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুত গলছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বরফের নিচে উষ্ণ সমুদ্রের পানির প্রবেশ এবং জোয়ার-ভাটার প্রভাবে হিমবাহটির গলন আগের মডেলে অনুমান করা মাত্রার চেয়ে বেশি হতে পারে। এর ফলে ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হিমবাহটির অবদান আগের হিসাবের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইন এবং নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের গবেষণাটি সোমবার নেচার কমিউনিকেশন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় অবস্থিত থোয়াইটস হিমবাহকে ‘বিচার দিবসের হিমবাহ’ বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান আয়তনের এই হিমবাহ বর্তমানে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রায় ৪ শতাংশ অবদান রাখছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, হিমবাহটি পুরোপুরি ধসে পড়লে এর বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই ফুটের বেশি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফস্তরকে সমুদ্রে প্রবাহিত হওয়া থেকে আটকে রাখার প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করে। সেই বাধা দুর্বল হলে দীর্ঘ মেয়াদে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে বিশ্বের বহু উপকূলীয় শহর ও জনপদ প্লাবনের ঝুঁকিতে পড়বে।
গবেষণার প্রধান লেখক মাত্তিয়া পইনেল্লি বলেন, হিমবাহের পশ্চাদপসরণের ক্ষেত্রে এর তলদেশে সমুদ্রের পানির প্রবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থলভাগের বরফ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে ভাসমান বরফস্তরে রূপ নেওয়ার যে সীমান্ত, তাকে বলা হয় ‘গ্রাউন্ডিং লাইন’। আগের মডেলগুলোতে এই সীমান্তকে তুলনামূলক স্থির ও সংকীর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি কয়েক মাইলজুড়ে বিস্তৃত হতে পারে। গবেষকেরা এই এলাকাকে ‘গ্রাউন্ডিং জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এই অঞ্চলে জোয়ার-ভাটার কারণে সমুদ্রের পানি বরফের নিচে ঢুকে আবার বেরিয়ে আসে। এতে বরফস্তর ওঠানামা করে এবং উষ্ণ পানি বরফের গভীরে পৌঁছে দ্রুত গলন ঘটায়। ‘টাইডাল পাম্পিং’ নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়া নতুন মডেলে যুক্ত করার পর বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা আর না বাড়লেও ২১০০ সালের মধ্যে থোয়াইটস হিমবাহের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সর্বোচ্চ ১ দশমিক ২ ইঞ্চি বাড়তে পারে—যা আগের পূর্বাভাসের প্রায় দ্বিগুণ।
হিমবাহটির নিচের ভূমি সমুদ্রের দিকে ক্রমশ গভীর হয়েছে। ফলে বরফ গলতে থাকলে আরও বেশি বরফ উষ্ণ পানির সংস্পর্শে আসতে পারে। সমুদ্রতলের দুটি উঁচু অংশ এখনো হিমবাহের প্রবাহ কিছুটা আটকে রেখেছে। তবে ‘মুজিনো রিজ’ নামে পরিচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে হিমবাহের সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। গবেষকদের হিসাবে, চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা ৬০ শতাংশ। এমনটি হলে হিমবাহটি দ্রুত পিছিয়ে যেতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইনের অধ্যাপক ও গবেষণার অন্যতম লেখক এরিক রিনো বলেন, নতুন ফলাফল আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিমাণ আগের ধারণার চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরছে। কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক টেড স্ক্যাম্বোসের মতে, ভবিষ্যতে এই হিমবাহের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে, তা নিরূপণে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হিমবাহের তলদেশে সরাসরি পর্যবেক্ষণ ছাড়া বরফ গলার প্রকৃত গতি সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিদ রবার্ট লার্টারের মতে, হিমবাহের নিচের পরিবেশ গবেষণায় বর্ণিত পরিস্থিতির চেয়েও জটিল হতে পারে।
গবেষকেরা ২০২৮ সালে থোয়াইটস হিমবাহে বিশেষ যন্ত্র স্থাপন করে বরফের নিচে সমুদ্রের পানির প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া সরাসরি পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা করছেন। এরিক রিনো বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় এমন দূষণ দ্রুত কমানো জরুরি। তবে নির্গমন কমানো হলেও ইতিমধ্যে সংঘটিত ক্ষতির কারণে ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়তে পারে। নতুন গবেষণাটি তাই উপকূলীয় জনপদ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন
সংস্করণ ২